গর্ভাবস্থায় কোন খাবার খাওয়া নিরাপদ এবং কোনটি এড়ানোউচিত

 

গর্ভাবস্থায় একটি নারীর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় গুলো একটি। এই সময়ে শরীরের ভিতরে নতুন একটি প্রাণ বেড়ে ওঠে, একটু অসাবধানতায় মা ও শিশুর উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সুস্থ গর্ভাবস্থায়  অন্যতম প্রধান শর্ত হলো - সঠিক খাবার নির্বাচন। 


গর্ভ অবস্থায় কোন খাবার খাওয়া নিরাপদ এবং কোনটি এড়ানোউচিত

অনেক সময়ই পরিবার, আত্মীয় বা ইন্টারনেটে ভিন্ন ভিন্ন পরামর্শের কারণে মায়েরা বিভ্রান্ত হয়ে যান। আসলে কোন খাবার সত্যি নিরাপদ? কোন খাবার এড়ানো উচিত? আর কোন খাবার, মায়ের শক্তি রক্ত, পুষ্টি এবং শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত করে?

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ, ভাষায় ধাপে ধাপে এবং বাস্তব জীবনে প্রযোজ্য এমন একটি গাইড প্রদান করছি, যা অনুসরণ করলে গর্ভাবস্থায় আপনার খাবার নিয়ে সকল সংশয় দূর হবে।


 গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবারের গুরুত্ব কেন?

গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এ সময়ে মায়ের শরীরের পাশাপাশি শিশুর সম্পূর্ণ বৃদ্ধি খাবারের উপর নির্ভর করে। একজন মা যে পুষ্টি গ্রহণ করেন, ঠিক সেই পুষ্টিই শিশুর মস্তিষ্ক, হাড়, রক্ত, চোখ ও স্নায়ুতন্ত্র গঠনে ব্যবহৃত হয়। গর্ভাবস্থায় রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়, তাই আইরন, ক্যালসিয়াম, ফোলেট, প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ জরুরী। সঠিক খাবার মাকে শক্তি দেয়, রক্তশূন্যতা রোধ করে এবং শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করে। অন্যদিকে ভুল  বা অপুষ্টিকর খাবার মায়ের দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং শিশুর ওজন কম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এ সময়েই খাবার শুধু ক্ষুধা মিটানোর জন্য নয়, বরং একটি নতুন জীবনের ভিত্তি শক্ত করতে সহায়তা করে। তাজা, পুষ্টিকর ও পরিমিত খাবারই গর্ভবতী মা ও তার শিশু সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।


গর্ভাবস্থায় কোন খাবারগুলো নিরাপদ ও উপকারী

নিচে এমন খাবারের তালিকা দেয়া হলো যা ডাক্তাররা সাধারণত গর্ভাবস্থায় খেতে বলে। এগুলো ভিটামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ফোলেট, ওমেগা -  ৩ সহ শিশুর বিকাশে প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি দেয়।

ফলমূল - প্রাকৃতিক ভিটামিনের ভান্ডার

ফলমূল গর্ভাবস্থায় প্রাকৃতিক ভিটামিনের অন্যতম সেরা উৎস। আপেল, কমলা, , কলা, মালটা , ডালিম, পেয়ারা, আঙ্গুর, এবং পুরোপুরি পাকা পেঁপে - এসব ফলে রয়েছে ভিটামিন C, ফোলেট, ফাইবার ও এন্টিঅক্সিডেন্ট, যা রক্ত বাড়াতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। কমলা ও মালটা মায়ের শরীরকে সতেজ রাখে, ডালিম রক্তশূন্যতা রোধ করে, আবার পেয়ারা ও আঙ্গুর হজম শক্তি বাড়ায়। প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের ফল খেলে মা ও শিশু উভয়ই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।

 সবজি - আয়রন ফাইবার ও ভিটামিনের উৎস

সবজি গর্ভাবস্থায় আয়রন, ফাইবার ও ভিটামিন এর অন্যতম প্রধান উৎস, যা মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরী। পালং শাক, লাল শাক, গাজর, ব্রকলি, ঢেঁড়স, মিষ্টি আলু ও কুমড়ার মত সবজিতে আছে আয়রন, যা রক্তশূন্যতা দূর করে এবং শিশুর রক্ত গঠনে সাহায্য করে। সবজির ফাইবার মায়ের হজম শক্তি উন্নত করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং শরীর কে হালকা রাখে। এছাড়া সবজিতে থাকা ভিটামিন A শিশুর দৃষ্টিশক্তি ও কোষ গঠনে সহায়তা করে, ভিটামিন C রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ভিটামিন K রক্ত জমাট বাঁধাই ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের সবজি খেলে মায়ের শক্তি বাজায় থাকে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শিশুর অঙ্গ-পতঙ্গ সুস্থভাবে বিকাশ পাই। তাই গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর সবজি খাওয়া একেবারেই অপরিহার্য।

প্রোটিন - শিশুর কোষ গঠনের প্রধান উপাদান

প্রোটিন গর্ভাবস্থায় শিশুর কোষ, অঙ্গ -প্রতঙ্গ  ও টিস্যু গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মায়ের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে শিশুর বৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে এবং মায়ের শরীর ও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, ডাল, ছোলা ,লালমসুর - এসব খাবার প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। এগুলো শিশুর, পেশী, হাড়,  মস্তিষ্ক ও রক্ত গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই সুস্থ গর্ভাবস্থা ও শিশুর সঠিক বিকাশে প্রোটিনের অপরিহার্য।

ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার- শিশুর হাড় ও দাঁতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার গর্ভাবস্থায় শিশুর হাড় ও দাঁতের সঠিক গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শিশুর হাড় দ্রুত শক্ত হতে থাকে, আর সেই প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম আসে মায়ের শরীর থেকে। তাই মাকে প্রতিদিন দুধ, দুই, ছানা, ডিম ও ছোট মাছের মত ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। ক্যালসিয়াম কম হলে মায়ের পায়ে ব্যথা, দাঁত দুর্বল হওয়া ও খিচুনি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম শিশুর হাড় মজবুত করে, দাঁতের গঠন ঠিক রাখে এবং সামগ্রিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। তাই গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়া একেবারে অপরিহার্য।

হোল গ্রেইন ও ভাত/ রুটি

হোল গ্রেইন ও ভাত রুটি গর্ভাবস্থায় শক্তির উন্নতম প্রধান উৎস। লাল চাল, ওটস, গমের রুটি, ভুট্টা ও ব্রাউন রাইসের মতো হোল গ্রেইন খাবার রয়েছে জটিল কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, বি ভিটামিন ও খনিজ উপাদান যা শরীরকে দীর্ঘ সময় শক্তি যোগায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখে। এসব খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়, হজম শক্তি ভালো রাখে এবং মাকে সারাদিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার শক্তি দেই। ভাত রুটি পরিমিত পরিমাণে খেলে শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে এবং মায়ের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়। তাই  গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য তালিকায় হোল গ্রেইন ও ভাত - রুটি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান 

পানি গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কারণ এটি মায়ের শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার পাশাপাশি শিশুর বৃদ্ধিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত পানি শরীরে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে, প্নাসেন্টায় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেই এবং এমনইউটিক ফ্লুইড ঠিক রাখতে সাহায্য করে। পানি কম হলে মাথা ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডিহাইড্রেশন ও মূত্রনালীর সংক্রমণে ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিদিন অন্তত  ৮ -  ১০  গ্লাস পানি পান করলে মায়ের শক্তি বজায় থাকে, হজম ভালো হয় এবং শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। তাই তাই গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত র্পানি পান করা অত্যন্ত জরুরী।

 

গর্ভাবস্থায় কোন খাবারগুলো নিরাপদ ও উপকারী


গর্ভাবস্থায় কোন খাবারগুলো এড়ানো উচিত

এখন আমি গর্ভাবস্থায়  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে- কোন খাবারগুলো খাওয়া যাবে না এবং কেন যাবেনা। এগুলো শিশু মায়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

কাঁচা বা আংশিক কাঁচা খাবার

গর্ভাবস্থায় কাঁচা বা আংশিক খাবার খাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এ ধরনের খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী থাকার সম্ভাবনা বেশি। কাঁচা ডিম, অপর্যাপ্ত সেদ্ধ মাংস, কাঁচা মাছ, বা নরম চীজে স্যালমনেলা, লিস্টেরিয়া বা টক্সোপ্লাজমা থাকতে পারে, যা মাইয়ের শরীরে  সংক্রমণ সৃষ্টি করে এবং শিশুর জন্য এবং শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এসব জীবাণু জোর জোর, বমি, ডায়রিয়্‌ পানি শূন্যতা এমনকি গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়ায়। গর্ভাবস্থায় মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকের তুলনায়, কিছুটা কম থাকে ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরোও বেড়ে যায়। তাই সব খাবার ভালোভাবে ধুয়ে, সম্পূর্ণ রান্না করে খাওয়া জরুরী। খাবার সঠিকভাবে রান্না হলে জীবাণু নষ্ট হয় এবং মা ও শিশুর উভয়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।  গর্ভাবস্থায় নিরাপদ খাদ্য অভ্যাসই সুস্থ শিশুর জন্মের ভিত্তি তৈরি করে।

 অতিরিক্ত পারদ যুক্ত মাছ

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত পারদযুক্ত মাছ খাওয়া ক্ষতিকর, কারণ পারদ শিশুর মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও দৃষ্টি শক্তির বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চমাত্রায় পারদ শরীরে জমে গিয়ে শিশুর বৃদ্ধি ধির করে, শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং এবং স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে সার্ক, সর্ড ফি্‌  কিং মেকারেল, টাইলফিস, বিগআই টুনা - এসব বড় ও সামুদ্রিক মাছের মধ্যে পারদের মাত্রা বেশি থাকে। এসব মাছ বেশি খেলে মায়ের শরীরে পারদের পরিমান বেড়ে যায়, যা প্লাসেন্টারের মাধ্যমে শিশুর শরীরে পৌঁছায়। গর্ভবতী মায়েদের জন্য নিরাপদ হল কম পারদ যুক্ত মাছ যেমন, ইলিশ, , রুই, কাতল, তেলাপিয়, সালমন,  ছোট মাছ ও চিংড়ি। এইসব মাছে প্রোটিন , ওমেগা -৩ ও খনিযে সমৃদ্ধ এবং শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক। তাই গর্ভাবস্থায় উচ্চপারুদযুক্ত মাছ এড়িয়ে, কম পারদযুক্ত মাছ বেছে খাওয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ক্যাফেন খাওয়া নিরাপদ নয়, কারণ এটি হৃদ স্পন্দন বাড়ায্‌ কিন্তু অনিদ্রা সৃষ্টি করে এবং শিশুর বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বেশি কফি বা চা পান করলে গর্ভপাত ও কম ওজনের শিশুর ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রতিদিন সীমিত পরিমান ক্যাফেন গ্রহনই সবচেয়ে নিরাপদ। 

ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার

গর্ভাবস্থায় ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়, কারণ এগুলোতে সাধারণত অতিরিক্ত লবণ, চিনি, তেল এবং কৃত্রিম সংরক্ষণ থাকে। বার্গার, পিৎজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, প্রক্রিয়াজাত মাংস, প্যাকেট জাত স্নাক্সস ও ইনস্ট্যান্ট নুডুলস এর মত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেই এবং ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এতে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাসট্রোল সোনাল ডায়াবেটিস, হজমের সমস্যা ও পানি শূন্যতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এসব খাবারে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের ঘাটতি থাকে, যা শিশুর সঠিক বৃদ্ধি ও মায়ের শক্তি বজায় রাখার জন্য জরুরী। তাছাড়া ট্রান্সফ্যাট  ও কৃত্রিম উপাদান লিভার, কিডনি ও হরমোনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গর্ব অবস্থায় ফাস্টফুড কম খেয়ে তার পরিবর্তে ঘরে তৈরি তাজা, পুষ্টিকর ও সুষম খাবার বেছে নেওয়ায় মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য সর্বোত্তম।

 পেঁপে ও আনারস

গর্ভাবস্থায় পেঁপে ও আনারস খাওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। সাধারণত পাকা পেঁপে খাওয়া নিরাপদ, কারণ এতে পুষ্টি ও ফাইবার রয়েছে যা হজমে সাহায্য করে। তবে কাঁচা বা আধাপাকা পেঁপে এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এতে লাটেক্স থাকে যা জরায়ুর সংকোচন বাড়াতে পারে। আনারস ও সীমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, কারণ এতে থাকা ব্রোমিলিন অতিরিক্ত পরিমাণে ক্ষতিকর হতে পারে, তবে স্বাভাবিক মাত্রায় এটি সাধারণত নিরাপদ। তাই গর্ভাবস্থায় ফাঁকা পেঁপে ও সামান্য আনারস খাওয়া যায়, কিন্তু পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা।

 অ্যালকোহল ও ধূমপান

গর্ভাবস্থায় অ্যালকোহল ও ধূমপান সম্পূর্ণভাবে এড়ানো উচিত কারণ এগুলো শিশুর উন্নয়নে। গুরুতর ক্ষতি করতে পারে অ্যালকোহল প্লাসেন্টা পেরিয়ে সরাসরি ব্রুনের শরীরে ভ্রূণের শরীরে পৌঁছে মস্তিষ্ক ও অঙ্গ পতঙ্গের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত। করতে পা। অন্যদিকে ধূমপানের নিকোটিন ও ক্ষতিকর রাসায়নিক শিশুর রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ কমিয়ে কম ওজন,  অপরিণত জন্ম এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া প্যাসিড স্মোকিং - অর্থাৎ অন্যের ধূমপানের ধোয়া ও সমানভাবে ক্ষতিকর। তাই সুস্থ গর্ভাবস্থা ও শিশু নিরাপদ বিকাশের জন্য অ্যালকোহল ও ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

দৈনন্দিন খাবারের সহজ তালিকা (বাংলাদেশের মেনু)

গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন কিভাবে খাবার সাজানো যায়, তার একটি সহজ মেনু

সকালের নাস্তা

সকালের নাস্তা গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মা ও শিশু কে দিনের শুরুতে প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি সরবরাহ করে। গর্ভবতী মায়েদের রাস্তায় ডিম, দুধ, ফল, ওটস,  শাকসবজি বা হোল গ্রেইন খাবার রাখা উচিত। এটি রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের সহায়তা করে এবং সারাদিন সুস্থ রাখে।

 দুপুরের খাবার 

গর্ভাবস্থায় দুপুরের খাবার হতে হবে পুষ্টিকর, সুষম ও সহজপাচ্য। এ সময় প্লেটে রাখা উচিত ভাত বা রুটি মতো কার্বোহাইড্রেট, মাছ-মাংস-ডিম বা ডাল থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আর সবজির মাধ্যমে ভিটামিন ও মিনারেল। পালং শাক, গাজর, লাউ, শসা বা যেকোনো সবুজ সবজি খেলে আয়রন ও ফাইবার পাওয়া যায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। ডাল বা মুরগির মাংস প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে। দুপুরের খাবারের সাথে দই রাখা ভালো, কারণ এতে ক্যালসিয়াম ও প্রবায়োটিক থাকে। অতিরিক্ত ঝাল, ভাজাপোড়া বা প্যাকেটজাত  খাবার এড়িয়ে চলা নিরাপদ। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করতেও ভুলবেন না।

বিকেলের নাস্তা 

গর্ভাবস্থায় বিকালের নাস্তা হতে পারে পুষ্টিকর ও হালকা খাবার। যেমন - ফল, দই,  বাদাম,  সেদ্ধ ডিম, চিড়া - দই বা সবজি স্যান্ডউইচ। এসব খাবার শক্তি যোগায়, হজমে সহায়তা করে এবং মায়ের শরীর ও শিশুর সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাতের খাবার

গর্ভাবস্থায় রাতের খাবার হওয়া উচিত পুষ্টিকর, হালকা, এবং সহজপাচ্য। রাতের মেনুতে থাকতে পারে ভাত বা রুটি, সাথে ডাল, শাকসবজি, ডিম বা মাছের মত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। অতিরিক্ত তেল মসলা এড়িয়ে রান্না করা খাবার খাওয়া ভালো। দুধ বা দই পেটে আরাম দেই এবং ক্যালসিয়াম যোগায়। ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার না খেয়ে অন্তত দুই ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, তবে অতিরিক্ত চা-কফি। পরিহার করা জরুরী সুষম রাতের খাবার মা ও শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি এবং ভালো ঘুমে সাহায্য করে।

গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন কিভাবে খাবার সাজানো যায়


গর্ভাবস্থায় বিশেষ কিছু খাবার কেন দরকার

নিচে খাবারের গুলোর পুষ্টিগুণ ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হলো।

  • আয়রন ঃ আইরন রক্ত বাড়ায়। গর্ভাবস্থায় রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকবারই।
  • উৎস; পালং শাক, গরুর মাংস, ডাল,  কিসমিস।
  •  ফোলেটঃ শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র গঠনের জন্য অপরিহার্য।
  • উৎস ; সবুজ শাক, কলা, কমলা, ডাল।
  •   ওমেগা - ৩ঃ শিশুর চোখ ও মস্তিষ্ক উন্নত করে।
  • উৎস ; ইলিশ মাছ, বাদাম, ডিম। 
  •  ক্যালসিয়াম ঃ হার শক্ত করে, দাঁতের ক্ষয় রোধ করে
  • উৎস; দুধ, দুই, ছোট মাছ।
  • ফাইবারঃ কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়।
  •  উৎস; ফল, সবজি, শস্য দানা।  

গর্ভাবস্থায় খাবার নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা

গর্ভাবস্থায় খাবার নিয়ে অনেক সাধারণ ভুল ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত, যা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ভয় বা  বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অনেকেই  মনে করেন গর্ভবতী নারীকে "দুইজনের খাবার" খেতে হয়, কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত খাওয়া নয় - পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার অনেকেই ভুল ভাবে বিশ্বাস করেন যে পেঁপে বা আনারস সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, যদিও পরিমাণে নিয়ন্ত্রিত ও পাকা পেঁপে সাধারণত নিরাপদ, এবং মাঝারি পরিমাণ আনারস ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে না। আরেকটি ভুল ধারণা হলো, মাছ বা ডিম খেলে শিশুর এলার্জি হতে পারে - আসলে এসব খাবার প্রোটিন ও পুষ্টিকর চমৎকার উৎস এবং সঠিকভাবে রান্না করলে তা উপকারী। কিছু মানুষ ভাবে কফি একবারে খাওয়া যাবে না, কিন্তু সীমিত পরিমানে (প্রতিদিন এক কাপের মতো) কফি সাধারণত নিরাপদ। আবার অনেক গর্ভবতী নারী ভয় পেয়ে ব্যায়াম এড়িয়ে চলেন, ভাবেন এতে ক্ষতি হবে, কিন্তু হালকা ব্যয়াম বরং সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এসব ভুল ধারণা দূর করার জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মা ও শিশু জন্য নিরাপদ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত খাদ্য অভ্যাস অনুসরণ করা যায়। 

গর্ভাবস্থায় খাবার নিয়ে ডাক্তারের বিশেষ পরামর্শ

গর্ভাবস্থায় মায়ের সুস্থতা এবং শিশুর সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে খাবার সম্পর্কে ডাক্তারের বিশেষ পরামর্শ মানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তাররা সাধারণত পরামর্শ দিন যে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, ডিম ও দুধজাত খাবার রাখা উচিত, যাতে শরীর পর্যাপ্ত ভিটামিন, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম পায়। অতিরিক্ত তৈলাক্ত, ঝাল, ফাস্টফুড বা সংরক্ষিত খাবার এড়িয়ে চলতে বলা হয়, কারণ এগুলো হজমে সমস্যা ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করা, ক্যাফেইন  কমানো এবং অ্যালকোহল ও ধূমপান সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা জরুরী। আয়রন ও ফলিক এসিডযুক্ত খাবার মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী, তাই ডাক্তাররা প্রায়ই এসব পুষ্টি নিয়মিত গ্রহণের পরামর্শ দেন। সবকিছুর পাশাপাশি, যে কোন খাবার সম্পর্কে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে মা ও শিশু দুজনে নিরাপদ থাকে। 

গর্ভাবস্থায় সুষম খাওয়ার একটি উদাহরণ

গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য মানে হলো এমনভাবে খাবার খাওয়া, যাতে মা ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় - দিনের শুরুতে ওটস, ডিম বা ফলসহ একটি পুষ্টিকর নাস্তা, দুপুরে ব্রাউন রাইস বা আটার রুটি, মাছ বা মুরগি, সঙ্গে শাক সবজি, বিকেলে ফল, দুধ বা দইয়ের মত হালকা ও স্বাস্থ্যকর খাবার; আর রাতে সহপাচ্য খাবার যেমন ভাত বা রুটি, ডাল, সবজি ও সামান্য প্রোটিন। সারাদিনে পর্যাপ্ত পানি পান এবং ভোজ্য- তেলেভাজা, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করাও। জরুরী । এতে মায়ের শক্তি ঠিক থাকে এবং শিশুর সুস্থ বিকাশে ও সহায়তা করে।

শিশুর মাস ভিত্তিক খাবারের ভূমিকা 

শিশুর মাস ভিত্তিক খাবার, অর্থাৎ মায়ের দুধ ভিত্তিক পুষ্টি, শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাস মায়ের দুধে শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, প্রাকৃতিক ও পুনাঙ্গ খাদ্য। এতে রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এন্টিবডি, সঠিক পরিমাণ ভিটামিন- মিনারেল এবং হজম যোগ্য প্রোটিন- ফ্যাট, যা শিশুকে সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও অপুষ্টি থেকে রক্ষা করে। মায়ের দুধ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও সহায়ক এবং মা ও শিশুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরোও দৃঢ় করে। জীবনের শুরুতে মাস ভিত্তিক খাবার শিশুর জন্য একটি অমূল্য পরিচর্যা। 

উপসংহার

গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবার নির্বাচন মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর, সতেজ ও সুষম খাবার যেমন ফল ,সবজি ,ডাল ,মাছ , ডিম এবং পর্যাপ্ত পানি শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি ও ভিটামিন যোগায়। অন্যদিকে কাঁচা বা আধাসিদ্ধ খাবার ,অতিরিক্ত ক্যাফেইন ,অ্যালকোহল, কাঁচা মাছ ,অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড ও প্রক্রিয়াজা ত খাবার এড়িয়ে নিরাপদ গর্ভাবস্থার জন্য সহায়ক। তাই সচেতনভাবে খাবার নির্বাচন পরিস্কার - পরিছন্নতা বজায় রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও নিরাপদ গর্ভধারণ নিশ্চিত করা সম্ভব। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url