শীতকাল আগমন উপলক্ষে আমাদের করণীয় কি কি

 প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে ঋতু পরিবর্তনের এক মনোরম অধ্যায় হল শীতকাল। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ । বাংলাদেশ ঋতু বৈচিত্র্যময় দেশ, শীত তার মধ্যে পঞ্চম  ঋতু । শীতের আগমন উপলক্ষে আমাদের অনেক করণীয়র বিষয়বস্তু থাকে। 


শীতকাল আগমন উপলক্ষে আমাদের করণীয়


বাংলাদেশের মতো উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের শীতকাল খুব দীর্ঘ না হলেও এর প্রভাব আমাদের জীবনে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের পরে - খাদ্য অভ্যাস, পোশাক, স্বাস্থ্য, কৃষিকাজ এমনকি সামাজিক জীবনেও। তাই শীতের আগমন শুধু একটা  প্রাকৃতিক পরিবর্তন নয়; এটি এক নতুন প্রস্তুতির আহ্বানও বটে।


পেজ সূচিপত্রে আমরা শীতকালে আগমন উপলক্ষে কি কি প্রস্তুতি নেওয়া উচিত



১.শীতকালে মানুষের শরীরের পরিবর্তনের প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য 

শীতের আগমন মানেই কুয়াশায় মোড়ানো সকাল, দুধ সাদা সূর্যদয়, হিমেল বাতাস, আর রাতের তারা ভরা আকাশ। শীত শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষের জীবনধারায়  পরিবর্তন ঘটায়।


✅শীতকালে মানুষের শারীরিক প্রভাব;

শীতকালে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়, ফলে ঠান্ডা, কাশি, জ্বর ইত্যাদি রোগ বৃদ্ধি পায়। শুষ্ক আবহাওয়া  ত্বক ও ঠোঁট ফেটে যায়। শীতকালে রক্তনালী গুলো সংকুচিত হয়, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদপিন্ডের জনিত সমস্যাও  দেখা দিতে পারে।

✅শীতকালে মানসিক প্রভাব

অনেকের মধ্যে অলসতা ও বিষন্নতা দেখা দেয়। সূর্যালোকের পরিমাণ কমে যায় মন খারাপও উদ্দমহীনতা বাড়ে।

তাই এ সময়ের  জন্য সঠিক পরিকল্পনা-ও করণীয় নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

২. শীতকাল আসার আগে শারীরিক প্রস্তুতি

শীত আসার আগে শরীরকে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

✅রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি;

প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম বিশ্রাম নিতে হবে।

গরম পানি পান করা অভ্যাস করতে হবে।

তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে, বিশেষ করে ভিটামিন "সি "সমৃদ্ধ খাবার যেমন  -  কমলা পেয়ারা,  লেবু খাবার তালিকা রাখতে হবে।

 ✅হালকা ব্যায়াম;

শীতকালে শরীর কম নাড়াচড়া করলে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। তাই সকালে বা বিকালে নিয়মিত হাটা, যোগব্যায়াম বা হালকা। দৌড়ানো উপকারী।

✅স্বাস্থ্য পরীক্ষা;, 

যাদের হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিস, হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিস আছে - তাদের শীতের আগেই ডাক্তারের  ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরী।


৩. শীতকালের পোশাক নির্বাচন

শীতকালে উষ্ণ পোশাক না থাকলে ঠান্ডা লাগা, সর্দি বা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।


🔯কাপড় প্রস্তুত করা;

আগেই গরম কাপড় বের করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখতে হবে। উলের সোয়েটার , জ্যাকেট , মাফলার , , গ্লাভস , টুপি ইত্যাদি প্রস্তুত রাখা উচিত। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য অতিরিক্ত উষ্ণ পোশাক নিশ্চিত করতে হবে।

🔯পোশাকের স্টোর;

একটি মোটা কাপড়ের চেয়ে একাধিক পাতলা স্তরের কাপড় পড়া বেশি কার্যকর। এতে শরীরে উষ্ণতা ধরে রাখা সহজ হয়।


৪. খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন

শীতের সময় শীতের তাপমাত্রা রক্ষা করতে বেশি ক্যালরি প্রয়োজন হয়, তাই খাদ্য অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন জরুরী।

👉পুষ্টিকর খাবার;

মাছ , মাংস , ডিম , দুধ , ডাউল প্রোটিন সরবরাহ করে ।

গরম খিচুড়ি, সুপ, দুধ চা, ওটস শরীর উষ্ণ রাখে।

শীতের সবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, মুলা, পালং শাক ইত্যাদি বেশি করে খেতে হবে।

👉পানি পান;

শীতকালে অনেকে কম পানি পান করেন ,যা  শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই সকলের উচিত প্রতিদিন ৮ গ্লাসপানি পান করা।

👉হালকা গরম পানিয় ;

চা,  কফি,  হারবাল ড্রিঙ্ক বা গরম দুধ শরীর উষ্ণতা বাড়াতে সাহায্য করে।


৫. শীতকালে  ত্বক ও চুলের যত্ন

শীতকালে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুল রুক্ষ হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত যত্ন নেওয়া দরকার।


(ক) ত্বকের যত্ন;

প্রতিদিন গোসলের পর মশ্চারাইজার ব্যবহার করা

গরম পানি দিয়ে বারবার মুখ ধুবেন না

রাতে ঘুমানোর আগে ঠোঁটে ও হাতে লিপবাম বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন।


(খ) চুলের যত্ন

সপ্তায় অত্যন্ত দুই দিন নারকেল তেল বা জলপাই তেল দিয়ে মেসেজ করুন,

চুলে হালকা কন্ডিশনার ব্যবহার করুন চুলে হালকা কন্ডিশনার ব্যবহার করুন

বেশি গরম পানি দিয়ে চুল ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন ।


৫. ঘরোয়া প্রস্তুতি

সীতা আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়িতে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার।

জানালা দরজা ঠিক করা

ঠান্ডা বাতাস ঢোকার রোদে দরজায় ফাক মেরামত করা

বিছানা প্রস্তুত

কম্বল , কাঁথা , চাঁদের রোদে শুকিয়ে রাখতে হবে যাতে জীবনু  নষ্ট হয়।

উষ্ণ পরিবেশ;

যদি সম্ভব হয় ঘরে হালকা হিটার বা কয়লার চুলা ব্যবহার করা যায়, তবে বায়ু চলাচল ব্যবস্থা রাখতে হবে।


৬. সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিক উদ্যোগ

শীত শুধু ধনীদের কাছে উপভোগ নয় - অসহায় মানুষের কাছে এটি এক কষ্টের ঋতু।

শীত বস্ত্র বিতরণ;

প্রতিবছর হাজারো দরিদ্র মানুষ যথাযথ পোশাকের অভাবে কষ্ট পাই। তাই সমাজের সচেতন মানুষের উচিত - পুরনো বা নতুন কাপড় সংগ্রহ করে বিতরণ করা।


আশ্রয়হীনদের পাশে দাঁড়ানো;

রাস্তার পাশে বা রেলস্টেশনে থাকা মানুষের জন্য সাময়িক আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে।


স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা;

উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের শীতকালীন ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।


৭.   কৃষি ও পরিবেশ প্রস্তুতি

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে শীতকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম।

কৃষকের করণীয়;

জমি আগে প্রস্তুত করতে হবে।

রবিশস্য যেমন গম সরিষা আলুপিয়া চাষের ব্যবস্থা নিতে হবে।

সেচ ও  সার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হবে।

পরিবেশের যত্ন ;

শীতকালে ধোঁয়া ও কুয়াশার কারণে বায়ু দূষণ বেড়ে যায়। তাই অপ্রয়োজনে আগুন জালানো বা বর্জ্য পুরানো থেকে বিরত থাকা উচিত।


৮.  শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন

এই দুই শ্রেণীর সবচেয়ে বেশি শীতের ক্ষতির শিকার হয়।

শিশুদের জন্য;

নিয়মিত গোসল করানো

ঠান্ডা খাবার না দেওয়া

স্কুলে যাওয়ার আগে উষ্ণপানি খেতে দেওয়া


বৃদ্ধদের জন্য;

নিয়মিত রক্তচাপ ডায়াবেটিস শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করা

রাতে উষ্ণ বিছানায় রাখা

গরম পানি ও সুপ খেতে দেওয়া।



৯.  মানসিক প্রস্তুতি ও আনন্দের প্রয়োজন

শীত শুধু কাজের সময় নয়, আনন্দের সময়ও ।

পারিবারিক সময়;

পরিবারের সবাই সন্ধ্যায় মিলে আড্ডা, গল্প, সিনেমা দেখা। বা গরম চায়ের কাপে সময় কাটানো - এতে মানসিক প্রশান্তি আসে।


সামাজিক উৎসব;

শীতকালে পিঠা উৎসব বনভোজন পিকনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান - এসব মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে।


আত্ম উন্নয়ন;

শীতে নীরব সকাল পড়াশোনা বা সৃজনশীল কাজের জন্য আদর্শ সময়। নতুন বই পড়া, লেখালেখি করা বা কোন সব গড়ে তোলা যেতে পারে।


উপসংহার

শীতের আগমন উপলক্ষে আমাদের জীবনে নতুন ছন্দ আনে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে সাধক গ্রহণ করতে হলে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং মানবিকতা। শীতের ঠান্ডা যেন আমাদের হৃদয়কে নয়, কেবল পরিবেশকেই শীতল করে - এ হোক আমাদের প্রত্যাশা।

যদি আমরা সবাই মিলে নিজেদের ও সমাজের মানুষদের জন্য কিছুটা উদ্যোগী হই, তবেই শীত হয়ে উঠবে এক আনন্দময় ও নিরাপদ ঋতু।




এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url