আধুনিক যুগে স্মার্টফোনের আসক্তি ও সমাধান
২১ শ শতাব্দীকে বলা হয় প্রযুক্তির যুগ। এই যুগে মানুষের হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী যন্ত্রটি হল - স্মার্টফোন। এক সময় ফোন মানে ছিল শুধু কথা বলা ও মেসেজ পাঠানো, কিন্তু এখন এটি হলো যেন এক ছোট্ট পৃথিবী।
এই ছোট ডিভাইসে আছে ব্যাংকিং, শিক্ষ্ ব্যবসা, বিনোদ,-খব্ কেনাকাটা -সবকিছুই। কিন্তু এই সহজলভ্যতায় এখন ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে এক নীরব বিপদ হিসেবে দেখা দিচ্ছে - সেটি হল স্মার্টফোন আসক্তি
পেজ সূচিপত্রে আমরা জানবো স্মার্টফোনের আসক্তি কি এবং কিভাবে এর সমাধান
স্মার্টফোনের আসক্তি কি?
স্মার্ট ফোন আসক্তি হল এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজেই অজান্তে অতিরিক্ত সময় ফোনে কাটা এবং এটি ছাড়া থাকতে পারে না
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Nomophobia (No - Mobile - Phobia) - অর্থাৎ মোবাইল ছাড়া থাকার ভয়।
যেমন
কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ফোন দেখে,
খাওয়ার সময় ফোনে ভিডিও দেখে,
ঘুমানোর আগে ফোন না দেখেলে ঘুম আসে না, বা ফোন বন্ধ থাকলে অস্থির লাগে - এই সময় স্মার্টফোনের আসক্তির লক্ষণ
কেন স্মার্টফোনে আসক্তি বাড়ছে
স্মার্টফোন আসক্তির পিছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে;
১. সহজলভ্যতা
আগে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে কম্পিউটার লাগতো। এখন একটি ফোনে সব কিছু করা যায় - পড়ালেখা, ব্যবস্ গেম, ভিডিও দেখা এমনকি অনলাইন আয় পর্যন্ত। ফলে মানুষ সারাক্ষণ ফোনের মধ্যেই সংযুক্ত থাকে।
২. সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণ
ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টিক টক , ইউটিউব - এই প্ল্যাটফর্ম গুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যে, ব্যবহারকারী যেন একবার ঢুকে আর বের হতে না পারে। একটার পর একটা ভিডিও, নোটিফিকেশ্ লাইক, কমেন্ট - সবকিছুই মস্তিষ্কে আনন্দের হরমোন ৯ ডোপামিন ০ বৃদ্ধি করে।
৩. একাকীত্ব
অনেকে একা থাকলে মন খারাপ থাকলে ফোনের সময় কাটাই। ধীরে ধীরে ফোনে হয়ে ওঠে। একমাত্র সঙ্গী।
৪. কাজ ও শিক্ষার প্রয়োজনে
বর্তমানে অফিসে ও ক্লাসের অনেক কিছুই মোবাইল ভিত্তিক। ফলে কাজের বাইরে গিয়েও ফোনের ব্যবহার বন্ধ করা যায় না।
৫. গেম ও বিনোদন
PUBG,Free Fire,TikTok, Instagram Reels - এসব এক মানুষকে দ্রুত আনন্দ দেই। এভাবে মস্তিষ্কে অভ্যস্ত হয়ে যায় "তাৎক্ষণিক আনন্দে" যা আসক্তি তৈরি করে।
স্মার্টফোনে আসক্তির লক্ষণ
স্মার্টফোনে আসক্ত মানুষদের কিছু সাধারণ আচরণ দেখা যায়। যেমনঃ
- সারাক্ষণ ফোন চেক করা, এমনকি দরকারযা না থাকলেও।
- ফোন ছাড়া অস্থিরতা বা রাগ অনুভব করা।
- পরিবারের সঙ্গে বসে ও ফোন ব্যবহার করা।
- খাবার বা ঘুমানোর সময় ফোন দেখা।
- সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা।
- পড়াশোনা বা কাজের মনোযোগ কমে যাওয়া।
- চোখে ব্যথা, মাথাব্যথ্ ঘুমের সমস্যা।
এগুলো যদি বারবার ঘটে তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা শুরু হয়েছে।
স্মার্ট ফোন আসক্তির মানসিক প্রভাব
১. মনোযোগ ঘাটতি
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে মনোযোগ নষ্ট হয়। পড়ালেখা বা কাজের সময় মন অন্যদিকে চলে যায় , কারণ মস্তিষ্ক বারবার ফোন চেক করার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
২. উদ্বেগ ও মানসিক চাপ
নতুন নোটিফিকেশন না পেলে বা পোস্টে কম লাইক এলে অনেকেই উদ্বেগ অনুভব করে এতে আত্মসম্মান কমে যায় , আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়।
৩. একাকীত্ব
ফোনে শত শত ফ্রেন্ড থাকলেও বাস্তব সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। এতে একাকীত্ব বাড়ে, মানুষ বাস্তব জীবনে আনন্দ ভুলে যায়।
৪. ঘুমের ব্যাঘাত
রাতের বেলা ফোন ব্যবহারে ঘুমের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের হরমোন মিলোটোনিনের ক্ষরণ বন্ধ করে দেই, ফলে হুম আসতে দেরি হয়।
৫. ডোপামিনের ভারসাম্যহীনতা
ফোন ব্যবহারে নোটিফিকেশন পাওয়া বা নতুন ভিডিও দেখা মস্তিষ্ক আনন্দ দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সে আনন্দ কমে যায়, ফলে মানুষ আরো বেশি সময় ফোনে কাটাতে চাই.
শারীরিক প্রভাব
- চোখের সমস্যাদীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় কারণে চোখে জ্বালা মাথাব্যথা চোখ ঝাপসা হয়ে যায়
- ঘাড় ও পিঠে ব্যথাসারাক্ষণ নিচু হয়ে ফোন দেখার সময় কারণে টেক্সট নেক নামের সমস্যা দেখা দেয়।
- হাতের ব্যথা একটানা টাইপ করা বা স্ক্রল করার কারণে আঙ্গুলে ব্যথা ও জয়েন্টে সমস্যা হতে পারে।
- ঘুমের অভাব ঘুমের ঘাটতি থেকে ক্লান্তি, রাগ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
সমাজে স্মার্টফোনের আসক্তির প্রভাব
১. পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়া
আগে সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই মিলে কথা বলতো, এখন সবাই নিজের স্মার্টফোনে ব্যস্ত। বাবা মার সন্তানকে সময় দিতে পারেনা, সন্তানও তাদের সঙ্গে কথা বলে না।
২. শিক্ষাঙ্গনে ক্ষতি
ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা চেয়ে গেম, রিলস, বা টিক টকি বেশি সময় দেই। ফলে মনোযোগ হারায়, রেজাল্ট খারাপ হয়।
৩. কর্মজীবনে প্রভাব
অফিসে কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট হয়। এর ফলে কাজের মান কমে, চাকরির পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে।
৪. সম্পর্কের সমস্যা
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস ও ঝগড়ার কারণ হয়। মানুষ বাস্তব অনুভূতির পরিবর্তে ভার্চুয়াল সম্পর্ক কে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ২০২৫ সাল হিসেবে একজন মানুষ, প্রতিদিন ঘরে থেকে .৭ ঘন্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে।
- বাংলাদেশ গড়ে একজন কিশোর প্রতিদিন প্রায় ৪ ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দেয়।
- 60% তরুণ স্বীকার করেছে যে তারা দিনে অন্তত ইয়১০বার অপ্রয়োজনে ফোন চেক করে।
স্মার্টফোন আসক্তির সমাধান
১. ব্যবহার সীমিত রাখা
প্রতিদিন ফোন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করে ফেলো। যেমন - সকালে ৩০ মিনিট, রাতে এক ঘন্টা।
"Digital Wellbing" বা "Scrern Time" অ্যাপব্যবহার করে সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
২. নির্দিষ্টকাজের জন্য ফোন ব্যবহার
ফোন শুধু দরকারই কাজেই ব্যবহার করা যেমন - ক্লাস, ব্যবসা, কল বা প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা। সময় কাটানোর জন্য নয়।
৩. ফোন মুক্ত সময় নির্ধারণ
দিনের কিছু সময় ( যেমন ঘুমানোর আগে, খাওয়ার সময় বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ) ফোন পুরোপুরি দূরে রাখা।
৪. নোটিফিকেশন বন্ধ করা
প্রয়োজন ছাড়া সব অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা। এতে মনোযোগ বাড়বে , উদ্বেগ কমবে।
৫. বাস্তব জীবনে বেশি সময় দাও
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া বই পড়া খেলাধুলা কর পরিবারের সঙ্গে কথা বল। বাস্তব জীবনে আনন্দ ভার্চুয়াল দুনিয়ার চেয়ে অনেক গভীর।
৬. ঘুমানোর আগে ফোন না দেখা
ঘুমের অন্তত এক ঘন্টা আগে ফোন ধরে রাখো। ফোনের পরিবর্তে বই পড়া বা মেডিটেশন করা যেতে পারে।
৭. নিজেকে সচেতন করা
নিজের ব্যবহার নির্মিত পর্যবেক্ষণ করো। দিনে কতবার ফোন আনলক করছো তা জানার চেষ্টা করো।
৮. ছোট ছোট অভ্যাস বদলাও
ফোনকে বিছানা পাচ্ছে রাখবে না, চার্জে লাগানোর অন্য ঘরে রাখো। খাওয়ার সময় ফোন টেবিলে রেখো না।\
৯. ডিজিটাল ডিটক্স করো
সপ্তাহে একদিন ফোন ছাড়া সময় কাটাও। পরিবার, প্রকৃতি বা প্রিয় শখের সঙ্গে সময় দাও।
১০. প্রয়োজনে সাহায্য নাও
যদি মনে হয় তুমি নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেনা তাহলে কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানের পরামর্শ নাও।
সচেতনতা ও সামাজিক ভূমিকা
- শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, সমাজকেও স্মার্টফোন আসক্তি রোধে ভূমিকা নিতে হবে ।
- স্কুল ও কলেজের সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।
- অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা সন্তানদের ফোন ব্যবহারে সীমা তৈরি করতে পারে।
- সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচারণা চালানো দরকার যেমন "Digital Detox Week" বা "Fone Free Day"।
উপসংহার
স্মার্ট ফোন আমাদের জীবনে অপরিহার্য অংশ এটি আমাদের সময় বাঁচায় তথ্য দেই জীবনের অনেক কিছু সহজ করে। কিন্তু সবকিছুই মতই এর ব্যবহার ও প্রয়োজন সীমা ও সচেতনতা।
স্মার্টফোন আমাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য নয় বরং আমরা বরং আমরা যেন স্মার্টফোনকে নিয়ন্ত্রণ করি সেটি আসল বুদ্ধিমত্তা।
দিনের শেষে মনে রাখতে হবে -
- বাস্তব হাসি
- প্রকৃত বন্ধুত্ব
- পরিবারও প্রাকৃতির সান্নিধ্য
এসবের বিকল্প কোন স্ক্রিন দিতে পারেনা।
স্মার্টফোন তোমার জীবনকে সহজ করুক, গ্রাস না করুক।
ব্যবহার কর, কিন্তু বন্দী হয়ো না
👉 প্রযুক্তি তখনই আশীর্বাদ যখন তা মানুষের হাতে থাকে - মানুষ যখন তার দাস হয়, তখনই সেটি বিপদ।
.

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url