সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে

 সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে: এ অনন্ত যাত্রার ডাক

মানুষের মন অদ্ভুত। সে শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে বন্দী থাকে, তখন তার মনে পড়ে থাকে নীল জলরাশির কোলে; আর যখন সমুদ্রের বালুচরে দাঁড়িয়ে অসীম জলরাশি দেখে, তখন তার চোখ খুঁজে পাহাড়ের চূড়া। 

সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে


এই দুই চিরন্তন বিরোধী সত্তার মাঝেই আবর্তিত হয় আমাদের যাপিত জীবন। আজ আমি সেই দুই প্রান্তের গল্পই বলতে চাই, যেখানে প্রকৃতি আমাদের ডেকে নিয়ে যায় তার মুঠোয়। সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড়ের ডাকে - এই এক বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের সকলের ভ্রমণের মূলমন্ত্র।

প্রথম অধ্যায়: ডাকের সূচনা

আমার বাড়ি ঢাকার অলিগলিতে। চারিদিকে শুধু গাড়ির হর্ন, ধুলো আর ব্যস্ততার নামে এক উন্মক্ত দৌড়। সপ্তাহের সাত দিন অফিস আর বাসার ফাঁদে  আটকে থাকা মন একসময় বিদ্রোহ করে। জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকি দূরের কোন কিছুর দিকে - যা নেই, অথচ আছে। মন বলে, "চলো কোথাও যাই।"

 ভ্রমণের সেই ডাক কখনো স্পষ্ট হয় না। এটি মৃদু বাতাসের মতো, গুনগুন করে কানে আসে। কখনো ভোরবেলায় চায়ের কাপে বসে থাকা বাষ্পের ভেতর দিয়ে ভেসে উঠে পাহাড়ের চূড়া; কখনো রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের আলো দেখতে দেখতে মনে হয়, এই আলোর বাইরেও কোন এক জায়গায় চাঁদ জ্বলছে সমুদ্রের বুকে। আসলে, সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে -এটা কোন বাক্য নয়, এটা আমাদের অস্তিত্বের একটা অংশ।

দ্বিতীয় অধ্যায়: সমুদ্রের কাছে যাত্রা

আমার প্রথম গন্তব্য ছিল কক্সবাজার। শুধু নামেই নয়, সাগরের বিশালতা আমাকে সব সময় টেনেছে। সেখানকার সমুদ্র সৈকতের বালুচরে পা রেখে যখন প্রথম দাঁড়াই, চোখের সামনে কেবল নীলের অসীমতা। ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিল, যেন বলছে, " তোর জন্যই অপেক্ষা।"

সমুদ্রের সেই ডাক অনন্য। সকাল বেলা সূর্য যখন ওঠে, তখন সমুদ্রের রং পরিবর্তন হয়। লালচে আভা মেখে সাগর যেন অন্যরকম রহস্যের জন্ম দেয়। সারাদিন ধরে পর্যটকদের কোলাহল থাকলেও সন্ধ্যেবেলা যখন জোয়ার আসে, তখন মনে হয় শুধু আমিই আর সাগর। সেই সময় সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে কথাটা বারবার মনে পড়ে। কারণ সাগর যতই ডাকুক না কেন, পাহাড়ের কথা মন থেকে মুছে যায় না। সমুদ্রের বালুচরে বসে আমি ভাবি, যদি এই মুহূর্তে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, তাহলে কেমন হতো?

তৃতীয় অধ্যায়: পাহাড়ের দেশে

সমুদ্রের সেই ভ্রমণের কয়েক মাস পরে এলো পাহাড়ের ডাক। বান্দরবান, রুমা, থানচি - এ নামগুলো যেন স্বপ্নের মত। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি যখন উঠতে থাকে, চারিদিকে সবুজের সমারোহ। নিচে সাঙ্গু নদী বয়ে যাচ্ছে, আর উপরে মেঘের সঙ্গে খেলা করছে পাহাড়ের চূড়া।

পাহাড়ের ডাক সমুদ্রের মতো সরব নয়। এটি একটু নিভৃত, একটু গভীর। যখন নীলগিরির চুড়ায় দাঁড়িয়ে নিচের সবুজ দেখলাম, মনে হল যেন আমি পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে। দূর থেকে শোনা যায় ঝরনার শব্দ, পাখির ডাক। সেখানে বসে এক কাপ চা খেতে খেতে হঠাৎ মনে হল, এই পাহাড়ের শান্ত মাঝেও কিন্তু লুকিয়ে আছে সাগরের অস্থিরতা। কারণ সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে -  এটা দুই বিপরীতের মিলনমেলা।

চতুর্থ অধ্যায়: মধ্যবতী কোন গন্তব্য

একবার আমি সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। এটি সাগরের বুকে এক টুকরো প্রবাল দ্বীপ। সেখানে সাগরের রুদ্ররূপ নেই; সাগর সেখানে শান্ত, মিষ্টি, যেন তার ডাকটা অন্যরকম। দ্বীপের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আমার মনে হল, এই যে সাগর, এটি পাহাড়ের মতই নিস্তব্ধ হতে পারে।

রাতে দ্বীপের এক পাশে বসে চাঁদনী রাতে সাগরের ঢেউ শুনছি। ঢেউয়ের ছন্দ যেন পাহাড়ে ঝরনার মতোই। তখন আবার মনে পড়ে সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে - কারণ এই দুইয়ের মাঝেই যেন এক অদৃশ্য সেতু আছে। সেন্টমার্টিনের শান্ত সাগর আমাকে পাহাড়ের কথা মনে করিয়ে দিল। আসলে, ভ্রমণ মানেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া। আর সেই খোঁজার পথে দুই বিপরীত আমাদের পথ দেখায়। 

পঞ্চম অধ্যায়: প্রকৃতির মাঝে মানবিক সম্পর্ক

আমার পরবর্তী ভ্রমণ ছিল শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে। যদিও এটি সাগর নয়, পাহাড়ও নয়, তবে সেখানেও পাহাড়ের আভাস আছে। দূর থেকে দেখা যায় খাসিয়া পাহাড়ের নীল আভা। চা বাগানের সবুজ চাদরের উপর যখন সকালের শিশির পরে, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজে হাতে ছড়িয়ে দিয়েছে মায়া।

সেখানে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা। তিনি সারা জীবন চা বাগানে কাজ করেছেন। তিনি বললেন, " বাবা মানুষের মনটাও এই বাগানের চায়ের পাতার মতো। কখনো তেতুল, কখনো মিষ্টি।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি কখনো সাগর দেখেছেন? তিনি হেসে বললেন, " দেখিনি বাবা, কিন্তু শুনেছি সাগর অনেক বড়। এই পাহাড়ের মতই বড়।" কথাটা শুনে আবার মনে হল, সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে - এই ডাক শুধু আমাদের না, এই ডাক সবার কাছে পৌঁছায়। হয়তো সেই বৃদ্ধ সাগর দেখিনি, কিন্তু তার মনের ভিতর সাগর বাসা বেধেছে।  

ষষ্ঠ অধ্যায়: ভ্রমণের ফেরতী পথে শিক্ষা

ভ্রমণ শেষে যখন শহরে ফিরি, তখন মনটা ভারী থাকে। কিন্তু প্রতিবার ফেরার সময় নতুন একটা শিক্ষা নিয়ে ফিরি। সমুদ্র আমাকে শেখায় ধৈর্য-তার ঢেউ যতই আছড়ে পড়ুক, শেষ পর্যন্ত ফিরে যাই। পাহাড় আমাকে শেখায় স্থিরতা-যতই কঠিন পথেই হোক, চুড়ায় পৌঁছাতে হয়।

প্রতিবার ভ্রমণের পর মনে হয়, আমি আরও একটু বড় হয়েছি। আরও একটু বুঝতে শিখেছি প্রকৃতির ভাষা। সেই ভাষা শেখার শুরুটা হয় এই ট্যাগলাইন দিয়েই - সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে। আসলে, প্রকৃতির কোন বিভাজন নেই। সাগর আর পাহাড় দুই-ই আমাদের মনের বিভিন্ন অবস্থার প্রতীক। কখনো আমরা অস্থির, কখনো স্থির; কখনো আমরা চাই বিশালতা, কখনো চাই নির্জনতা। ভ্রমণ আমাদের সেই দুই চাওয়াকেই পূরণ করে।  

সপ্তম অধ্যায়; ডাক শুনতে শেখা

শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতায় আমরা অনেক সময় শুনতে পাই না এই ডাক। কানে হেডফোন, চোখে মোবাইল, মগজের টেনশন। কিন্তু একটু চুপ করলেই, একটু জানালার বাইরে তাকালেই শোনা যায় প্রকৃতি ডাকছে। সেটা ছাদে পরা বৃষ্টির ফোঁটা হতে পারে, কিংবা দূরের কোন নীল পাহাড়ের আভাস।

একবার এক বন্ধু আমাকে বলল, " তোর সব সময় ঘুরতে যেতে হয় কেন?" আমি বললাম, " কারণ ডাক শুনতে পাই।" বন্ধু হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু আমি জানি, সেই ডাক যারা শুনতে পাই, তারাই প্রকৃত ভ্রমণ প্রেমী। আর সেই ডাকের মূল মন্ত্র - সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে।   

অষ্টম অধ্যায়: ভ্রমণ কথার শেষ নাই

ভ্রমণের শেষ নেই। যেমন সাগরের ঢেউ থামেনা, তেমনি পাহাড়ের চূড়া শেষ হয় না। প্রতিবার ভ্রমণে গিয়ে নতুন কিছু দেখি, নতুন কিছু শিখি। কখনো সাগরের গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করে, কখনো পাহাড়ের উচ্চতা। কিন্তু সব সময় মনের গহীনে বেজে উঠে সেই সুর - সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে।

একবার আমি ভাবলাম, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা বেশি ডাকে? পরে বুঝলাম, এটা তুলনার বিষয় নয়। কারণ সাগর যেমন ডাকে, পাহাড়ও তেমনি ডাকে। দুই ডাকের মাঝেই আছে জীবন। কখনো তুমি সমুদ্রের বালুচরে বসে ভাববে পাহাড়ের কথা; আবার কখনো পাহাড়ের চূড়ায় বসে শুনবে সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। এটাই তো জীবনের নিয়ম - বিরোধীরাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।


উপসংহার: ডাকে সাড়া দেওয়ার সময়

আমাদের জীবনটা অনেকটা গল্পের মত। শুরু, মধ্যে, শেষ - সবকিছুই আছে। কিন্তু এ গল্পের মধ্যবর্তী অধ্যায়গুলো ভ্রমণ দিয়েই লেখা উচিত। কারণ ভ্রমণ আমাদের বাঁচতে শেখায়। দেখতে শেখায়। ভালবাসতে শেখায়।

আমি যখন ছোটবেলায় প্রথম কক্সবাজার যাই, তখন বালির স্তুপ করে বাড়ি বানাতাম। ঢেউ এসে ভেঙ্গে দিত। তখন রাগ হত। এখন বুঝি, ঢেউ ভাঙতে শেখায় যে কিছু জিনিস স্থায়ী নয়। পাহাড়ে উঠে যখন প্রথম চুড়াই পৌঁছায়, তখন হাপিয়ে উঠতাম। এখন বুঝি, কঠিন পথ পেরোলেই সৌন্দর্যের অপেক্ষা করে।

আজকের এই আর্টিকেলের মূল বক্তব্য একটাই - প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দেরি করা যাবে না। সেই ডাক যখন আসে, তখন ওই বেরিয়ে পড়তে হয়। কারণ সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে, আর সেই ডাক চিরন্তন। আমরা যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন এই ডাক আসবে। আসবে সাগরের নীল জলরাশি থেকে, আসবে পাহাড়ের সবুজ চূড়া থেকে।

তো, এখন বলো, তুমি কি সেই ডাক শুনতে পাও? তোমার মন কি বলে না, "চলো আজই বেরিয়ে পড়ি"? যদি বলে, তাহলে আর দেরি কেন? ব্যাগ গোছাও, গন্তব্য ঠিক কর। আর মনে রেখো, যেখানেই যাও না কেন, সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে হয় সাগর, না হয় পাহাড়। আর কিছু না পেলে, জানালার ধারে বসে চাঁদ দেখো - সেও তো এক সাগর, সেও তো এক পাহাড়। 

শেষ কথা: ভ্রমণ শুধু দূরবর্তী কোনো গন্তব্যে যাওয়ার নাম নয়। এটি মনের গহীনে যাওয়ার নাম। আর সেই যাত্রাপথে সাগরের ঢেউ ডাকে পাহাড় ডাকে - এই ডাকটাই যেন আমাদের পাথেয় হয়ে থাকে। প্রকৃতি যতদিন আছে ততদিন এই ডাক থাকবে। আর আমরাও ততদিন ভ্রমণ করব, নিজেকে খুঁজবো, হারাবো, আবার খুঁজে পাবো।

যদি কখনো ভ্রমণের ইচ্ছা জাগে, তাহলে শুধু গন্তব্য নয়, মনে রেখো সাগর আর পাহাড় দুই-ই তোমার মনকে স্পর্শ করবে। এই দুইয়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে সুন্দর পৃথিবীর চাবিকাঠি। তাই ডাকে সাড়া দিতে শেখো। বাকি পথ নিজেই  মসৃণ হয়ে যাবে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url