এইচএসসি শেষে সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচন উপায়


এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। এখন কি হবে? এ প্রশ্নটি সম্ভবত তোমার মনে এখন সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে। বার বছর পথ চলা, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এখন পুরো একটা নতুন পৃথিবী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। সামনে এখন ক্যারিয়ার গড়ার পালা। কিন্তু কোথায় থেকে শুরু করবে? কোন পথটা তোমার জন্য সেরা হবে? এই বিশাল সিদ্ধান্তটা নেওয়ার চাপে তুমি হয়তো অভিভূত। কিন্তু একদমই চিন্তার কিছু নেই। এই ব্লগটি শুধু তোমাদের জন্যই রচিত ।  

এইচএসসি শেষে সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচন উপায়


আজকে আমরা খুব সহজ ও সুন্দর ভাষায় আলোচনা করব, কিভাবে তুমি তোমার পছন্দের ক্যারিয়ারটা খুঁজে বের করবে এবং সেটি করার জন্য সঠিক পরিকল্পনা করবে। কারণ সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচনই পারে তোমার পুরো জীবনটাকে বদলে দিতে।  

শুরুতে একটু থামো, নিজেকে সময় দাও

পরীক্ষা শেষ। এরপর একটা বড় শূন্যতা কাজ করে মনে। কয়েক মাসের মধ্যে রেজাল্ট, তারপর ভর্তি যুদ্ধ। সবকিছু মিলিয়ে মনে হতে পারে, এই মুহূর্তেই বুঝি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু তা না। সারা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে নিত্তে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া খুব জরুরী। এই সময়টাতে তুমি কি করতে পারো?

প্রথমত, গত কয়েকটা বছর ফিরে দেখো। কোন কোন বিষয় তোমার ভালো লাগতো? কোন কাজগুলো করতে তোমার সবচেয়ে আনন্দ লাগতো? শুধু বইয়ের পড়া না, সহজ শিক্ষা কার্যক্রম, গ্রুপ স্টাডি, বা কোন সৃজনশীল কাজ - এগুলোর মধ্যেই তোমার আগ্রহের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে। অনেক সময় আমরা যা ভালবাসি, তাই আমাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার হয়ে উঠে।

দ্বিতীয়ত, যদি কিছুদিনের জন্য পুরোপুরি পড়াশোনা থেকে বিরত নিতে চাও, তাহলে 'গ্যাপ ইয়ার' নিতে পারো। এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তুমি বিভিন্ন ধরনের খন্ডকালীন চাকরি করতে পারো। এতে করে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা হবে, আবার বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির কাজের ধরন সম্পর্কেও ধারণা পাবে। যেমন, কোন দোকানে কাজ করে দেখবে বিক্রির কাজ কেমন লাগে,  অথবা কোন অফিসে খন্ডকালীন কাজ করে সেটার পরিবেশ কেমন তা বুঝতে পারবে। এই কাজের অভিজ্ঞতা তোমার ক্যারিয়ার বেছে নিতে অনেকখানি সাহায্য করবে।

নিজেকে চিনতে হবে, জানতে হবে পছন্দ-অপছন্দ

আমরা প্রায়ই অন্যদের দেখে পথ বেছে নিই। বন্ধু হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার, আমাকেও তাই হতে হবে; আত্মীয় বলেছে ডাক্তারি ছাড়া ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু আসল কথা হলো, তোমার ক্যারিয়ার তোমাকে চলতে হবে, তোমার পছন্দ আর সামর্থের উপর ভিত্তি করে। তাই নিজেকে কিছু প্রশ্ন করো:

👉তুমি মানুষজনের সাথে মিশতে পছন্দ করো, নাকি একা একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ কর? 

👉 তুমি কি সমস্যা সমাধান করতে ভালোবাসো, নাকি সৃজনশীল কিছু তৈরি করতে আগ্রহী?

👉 দায়িত্ব নিয়ে দলকে নেতৃত্ব দিতে চাও, নাকি নির্দেশ মত কাজ করতে স্বস্তি পাও?

👉 তোমার মধ্যে কি বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা নেশা আছে, নাকি ইতিহাসের পাতা উল্টাতে বেশি ভালো লাগে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই তুমি আন্দাজ পাবে, তোমার জন্য কোন সেক্টর টা উপযুক্ত হতে পারে। কারণ সঠিক ক্যারিয়ার মানে শুধু টাকার পাহাড় নয়, সে কাজ করে মানসিক শান্তি এবং তৃপ্তিও পাওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা বেছে নেওয়া ক্যারিয়ারের পরে আমাদের আগ্রহের জায়গা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়, তখন জীবনটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে। তাই নিজের ভালোলাগাটাকেই প্রাধান্য দাও। 

উচ্চশিক্ষা: দেশে না বিদেশে

এইচএসসি পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট - এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ আছে। এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভালো মানের শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তবে ভর্তি হতে গেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে তোমার এইচএসসি রেজাল্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভালো ফলাফল তোমাকে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভালো বিষয় পছন্দ করার সুযোগ করে দেবে।

অনেকেরই স্বপ্ন থাকে বিদেশে পড়াশোনা করার। উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ জনপ্রিয়। বিদেশে পড়তে গেলে সাধারণত ভালো এইচএসসির ফলাফল এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ যেমন(IELTS বা TOEFL) দরকার হয়। কিছু কিছু দেশে ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্সের সুযোগও দেয়। যেমন, জার্মানিতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারং বা সুইডেনে টেক্সটাইল ডিজাইন নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে, যদি তোমার ফল ভালো থাকে। 

কিন্তু বিদেশে পড়তে যাওয়াটা শুধু নামের জন্য নয়। সেটা খুবই ব্যয়বহুল এবং সাংস্কৃতিকভাবে খাপ খাওয়ানোটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো করে গবেষণা করে নাও, তোমার পছন্দের বিষয়টা কোন দেশে সবচেয়ে ভালো পড়ানো হয়, সেখানে চাকরির বাজার কেমন এবং পড়ার খরচ কেমন হবে সেটা জেনে নেওয়া জরুরী।

বিকল্প পথ: ডিপ্লোমা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ

সবসময় যে চার বছরের গ্রাজুয়েশন করতেই হবে, এমন কোন কথা নেই। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য ডিপ্লোমা বা ভোকেশনাল ট্রেনিং অনেক ভালো একটি অপশন।অ্যাপ্রেন্টিসশিপ বা শিক্ষা্নবিস কর্মসূচি এখন খুব জনপ্রিয়। এখানে তুমি কাজ করতে করতে শিখবে, আর পাশাপাশি বেতনও পাবে। ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, অটোমোবাইল মেকানিকের মতো কাজগুলো এখন আর আগের মতো নিচু 'শ্রেণির' কাজ নয় বরং এগুলো সম্মানজনক ও চাহিদা সম্পন্ন পেশা। 

বাংলাদেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করার পরে সরাসরি চাকরির বাজারে প্রবেশ অনেক সুযোগ রয়েছে। দেশের বড় বড় গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রচুর চাহিদা। নোমান গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, হামিম গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রোডাকশন অফিসার, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইন্সপেক্টর, টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করার সুযোগ মেলে। শুরুতেই বেতন ১৫০০০ থেকে২৫০০০ টাকা হতে পারে, যা অভিজ্ঞতার সাথে আর ও বাড়ে।

এছাড়াও রয়েছে পেশাগত সার্টিফিকেট কোর্স। যেমন হিসাববিজ্ঞানে আগ্রহ থাকলে এইচএসসির  পরেই ACCA (অ্যাসোসিয়েশন অফ চার্টার্ড সার্টিফাইড অ্যাকাউন্ট্যান্টস)  কোর্সে ভর্তি হতে পারো। এই কোর্সটি সাশ্রয়ী এবং অল্প সময়ে শেষ করে আন্তর্জাতিক মানের হিসাববিদ হওয়া যায়। মাত্র ২.৫ থেকে তিন বছরে কোর্স শেষ করে তুমি বিএসসি ডিগ্রিও অর্জন করতে পারো অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি থেকে। শুধু তাই না, ACCA কোর্স শেষ করলে দেশে ও বিদেশে চাকুরীর বাজারে তোমাকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখবে।

চাকুরীর বাজার: দেশ ও বিদেশে


এইচএসসি পাশ করার পর অনেকেই আছেন যারা সরাসরি চাকরিতে যোগ দিতে চান। তাদের জন্যও বিভিন্ন অপশন আছে। বিপণন, বিক্রয় বা সেলসের চাকরিতে এইচএসসি পাশের আ আবেদন করতে পারেন। অনেক কোম্পানি এইচএসসি পাস করা ফ্রেসার দের নিয়োগ দেয়। বাজের ইলেকট্রনিক্স, শোরুম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মার্কেটিং বিভাগে এইচএসসি পাশদের চাহিদা আছে। তবে এ ক্ষেত্রে ভালো যোগাযোগ দক্ষতা এবং কাজ শেখার আগ্রহ থাকা জরুরী।

তবে চাকরির বাজারে শুধু এইচএসসি পাশ করে বসে থাকলে চলবে না। বর্তমানে কম্পিউটার জ্ঞান, ইংরেজিতে দক্ষতা, এবং সমস্যার সমাধানের সক্ষমতা - এগুলো প্রায় সব চাকরিতেই দরকার হয়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি এই দক্ষতা গুলো অর্জন করা জরুরী। কারণ দ্রুত বদলানো এ অর্থনীতিতে শুধু সার্টিফিকেট নয়, তোমার কাজ করার সামর্থ্যই তোমার আসল ক্যারিয়ার গেড়ে দেবে। 

বিদেশে চাকুরীর ক্ষেত্রেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ভালো সম্ভাবনা আছে। হংকং, জাপান, থাইল্যান্ড, এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, কোয়ালিটি টেকনিশিয়ান, প্রোডাকশন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে। জাপানে বেতন মাসে ১৬০০ থেকে ২০০০ ডলার ( বাংলাদেশি টাকায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা) পর্যন্ত হতে পারে। আর ইউরোপে জার্মানি বা অস্ট্রিয়ার মতো দেশে বেতন হতে পারে ৩৫০০ থেকে৫৩০০ ইউরো , যা বাংলাদেশি টাকায় ৩.৫ লাখ থেকে ৫.৩ লাখ টাকারও বেশি।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা জানা জরুরী

ক্যারিয়ার গড়ার পথে আরও কিছু বিষয় মনে রাখা দরকার।

১। নেটওয়ার্কিং বা যোগাযোগ গড়ে তোলা: যাদের পেশায় তুমি আগ্রহী, তাদের সাথে কথা বল। তারা কিভাবে তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিল, তাদের কাজের ভালো-মন্দ কি- এসব জানতে চাও। ক্যারিয়ার ফেয়ার, সেমিনার বা অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের সংস্পর্শে আসতে পারো। তাদের পরামর্শ তোমার পথচলা কে আরো অনেক মসৃণ করবে। 

। আর্থিক বিষয় মাথায় রাখা: যে পেশাটি বেছে নিচ্ছো, তার শুরুর দিক বেতন কেমন হবে, ভবিষ্যতে কতদূর যাওয়া যাবে - সেটা জেনে নেওয়া জরুরী। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে খরচ কেমন হবে, বৃত্তি বা ফিনান্সিয়াল এইড পাওয়ার সুযোগ আছে কিনা তাও দেখে নিতে হবে।

৩। মানসিক প্রস্তুতি নমনীয়তা: জীবনের সব পরিকল্পনা মত হয় না। তাই মন খারাপ না করে বরং নমনীয় হও। যদি প্রথমে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ না-ও পাও, অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে বা অন্য কোন কোর্স করে পরে সুযোগ তৈরি করতে পারো। অনেকে অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্স এর সম্পূর্ণ নতুন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে, কারণ তখন তাদের আসল আগ্রহের জায়গাটা খুঁজে পাই। যেমন, কেউ বিজ্ঞানে পড়াশুনা করে পরে ডিজাইন নিয়ে পড়তেও পারে, কারণ তার আসল আগ্রহ টা ছিল সেখানেই। 

৪। মেন্টর খোঁজা: জীবনে এই ক্রান্তিলগ্নে একজন মেন্টর বা পদপ্রদর্শক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তোমার পরিবারের বড় কেউ, শিক্ষক, অথবা তোমার পছন্দের পেশায় প্রতিষ্ঠিত কেউ- তাদের সাথে তোমার পরিকল্পনা শেয়ার করো। তাদের দিকনির্দেশনা তোমাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

শেষ কথা

এইচএসসি শেষ করা মানে জীবনের শেষ নয়, বরং নতুন করে বাঁচার সূচনা। একটা পরীক্ষা বা একটা রেজাল্ট কখনো তোমার সামর্থকে নির্ধারণ করতে পারে না। অনেক দরজা তোমার জন্য খোলা। তাই একটু সময় নিয়ে ভাবো, নিজের ভালোলাগার জায়গাটা খুঁজে বের কর। সে অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নাও। মনে রাখবে, শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট নয়, তোমার দক্ষতা, কাজের প্রতি ভালবাসা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই তোমাকে সফলতার চূড়ায় পৌঁছে দেবে।

তোমার ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বরং এটাকে একটি উত্তেজনাপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নাও। নতুন কিছু শেখার, নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার এবং নিজেকে আবিষ্কার করার এই সুযোগ কাজে লাগাও। আর হাঁ, জীবনে চলার পথেও যদি একটু হোচট  ও খাও, সেটাকে ব্যর্থতা বলে মনে করো না। সেটাকে শেখার পাঠ  হিসেবে নাও। কারণ, একটি মাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জীবনের ছোট ছোট অনেকগুলো সিদ্ধান্ত মিলেই গড়ে ওঠে তোমার অনন্য এক ক্যারিয়ার

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url