স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ
আমরা এখন ডিজিটাল যুগে বাস করছি, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সকালে নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের শহরের আলো, ঘুরতে যাওয়া থেকে শুরু করে বিশেষ অনুষ্ঠান - প্রায় সবকিছুই আমরা স্মার্টফোন দিয়ে ছবি তুলি। কিন্তু তোলা ছবি অনেক সময় ঠিক সেই মুহূর্তের আবেদন ফুটিয়ে তোলে না। আলো কম ছিল, রং বিবর্ণ হয়ে গেছে, বা ছবিতে অপ্রয়োজনীয় কিছু অংশ চলে এসেছে - এমন সমস্যা প্রায়ই হয় ।
ঠিক এখানেই কাজে আসে স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ। এই অ্যাপ
গুলোর সাহায্যে আপনি আপনার সাধারণ একটি ছবিকে অসাধারণ করে তুলতে পারেন। মাত্র
কয়েকটি ট্যাপেই ছবির উজ্জ্বলতা বাড়ানো, রং
পরিবর্তন, ব্যাকগ্রাউন্ড মুছে ফেলা, এমনকি প্রফেশনাল মানে ডিজাইন তৈরি
করা সম্ভব।
আজকের এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা জানবো
স্মার্টফোনের ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ সম্পর্কে। কোন অ্যাপটি আপনার
জন্য সবচেয়ে ভালো হবে, কিভাবে এগুলো ব্যবহার করবেন, এবং ছবি এডিটিংয়ের কিছু দারুন টিপস - সবকিছু থাকবে এখানে।
পেজ সূচিপত্রে কিভাবে স্মার্ট ফোনে ছবি এডিট করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা
- কেন স্মার্টফোনে ছবি এডিট করা জরুরী?
- স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ: বিস্তারিত তালিকা
- কিভাবে সঠিক অ্যাপ নির্বাচন করবেন?
- স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার কিছু প্রো টিপস
- ছবি এডিটিংয়ের কিছু সাধারণ ভুল ও সমাধান
- ভবিষ্যতে ছবি এডিটিং এর ট্রেন্ড
কেন স্মার্টফোনে ছবি এডিট করা জরুরী ?
ছবি তোলার পর সেটিকে আর ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য এডিটিং অপরিহার্য। ডিএসএলআর ক্যামেরা হোক বা স্মার্টফোন - তোলা ছবিতে কিছু না কিছু উন্নতির সুযোগ থাকে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করার আগে এডিটিং প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছবি এডিটিং কেন জরুরী, তার কয়েকটি কারণ দেখি:
১. আলো ও রঙের সমন্বয়: অনেক সময় ছবি তোলার সময় ভালো ঠিকমতো না পড়ায় ছবির বিবর্ণ অতিরিক্ত উজ্জ্বল হয়ে যায়। এডিটিং অ্যাপ দিয়ে আপনি এক্সপোজার, কনট্রাস্ট, স্যাচুরেশন ইত্যাদি সহজে ঠিক করতে পারেন।
২. অবাঞ্ছিত অংশ অপসারণ: ছবিতে এমন কিছু থাকতে পারে যা আপনি রাখতে চান না - পেছনের মানুষ, কোন ময়লা বা অপ্রয়োজনীয় জিনিস। ক্রপ বা ক্লোন টুল দিয়ে সেগুলো সরিয়ে ফেলা যায়।
৩. সৃজনশীলতা প্রকাশ: এডিটিংয়ের মাধ্যমে আপনি আপনার নিজস্ব ইস্টাইল তৈরি করতে পারেন। ফিল্টার, ইফেক্ট, টেক্সট যোগ করে ছবিকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলতে পারেন।
৪. সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য প্রস্তুতি: ইনস্টাগ্রাম, ফেইসবুক বা টিকটক এর জন্য আলাদা সাইজের এবং মানের ছবি দরকার হয়। এডিটিং অ্যাপ দিয়ে সেটি সহজেই করা যায়।
এখন প্রশ্ন হল, বাজারে এত রকমের অ্যাপ থাকলে কোন গুলো সত্যি সেরা ? চলুন জেনে নেই স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত।
স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ: বিস্তারিত তালিকা
1. Adobe Lightroom: প্রফেশনালদের প্রথম পছন্দ
অ্যাডোব লাইটরুম নামটি ছবি এডিটিং এর জগতে খুবই পরিচিত। এটি মূলত কম্পিউটারের জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে এর মোবাইল ভার্সন এতটাই শক্তিশালী যে অনেক প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ও স্মার্টফোনে এই অ্যাপ ব্যবহার করেন।
মূল বৈশিষ্ট্য সমূহ:
- RAW ফাইল এডিটিং এর সুবিধা
- প্রিসিস কন্ট্রোলের জন্য কার্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট
- প্রিসেট ব্যবহারের মাধ্যমে এক ক্লিকে ইফেক্ট
- সিলেক্টিভ এডিটিংয়ের জন্য ব্রাশ ও গ্রাজুয়েটেড ফিল্টার
- হাই-এন্ড নয়েজ রিডাকশন
কিভাবে ব্যবহার করবেন:
লাইট রুম ব্যবহার করা খুব সহজ। ছবি ওপেন করার পর নিচে টুলবার থেকে বিভিন্ন অপশন পাবেন। লাইট অপশন দিয়ে উজ্জ্বলতা, কনট্রাস্ট, হাইলাইটস, শ্যাডো অ্যাডজাস্ট করতে পারেন। কালার অপশন দিয়ে রঙের স্যাচুরেশন ও হিউ পরিবর্তন করতে পারবেন। ইফেক্ট অপশন থেকে টেক্সচার, ক্লারিটি ও ডিহেজ যোগ করতে পারেন।
সুবিধা:
- সম্পূর্ণ ফ্রি ভার্সনে অনেক ফিচার পাওয়া যায়
- প্রফেশনাল মানের আউটপুট
- ক্লাউড স্টোরেজের সাথে সিঙ্ক করার সুবিধা
- কিছু প্রিমিয়ার ফিচারের জন্য মাসিক ফি দিতে হয়
- নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য একটু জটিল মনে হতে পারে
২.Sanpseed: গুগলের সেরা উপহার
গুগলে তৈরি Sanpseed বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি এডিটিং অ্যাপগুলোর একটি। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি হওয়ায় এবং প্রচুর ফিচার থাকায় সবার কাছেই এটি প্রিয়। স্মার্টফোনে ছবি এডিট করার সেরা অ্যাপসমূহ এর তালিকায় এর অবস্থান প্রথম সারিতে।
- ২৯ টি টুল ও ফিল্টার
- সিলেক্টিভ অ্যাডজাস্টমেন্টের জন্য পয়েন্ট কালার
- হিলিং ব্রাশ দিয়ে ছবির দাগ মুছতে পারেন
- ডবল এক্সপোজার ইফেক্ট
- ফেস Enhance দিয়ে পোট্রের্ট এডিটিং
কিভাবে ব্যবহার করবেন:
ওপেন করলে "স্টাইল" ও" টুলস" নামে দুটি প্রধান অপশন দেখতে পাবেন। স্টাইল থেকে প্রি-মেইড ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। টুলস অপশনে গেলে সব ধরনের এডিটিং টুল পাবেন। টিউন ইমেজ দিয়ে মৌলিক এডিটিং, ডিটেইলস দিয়ে শার্ফনেস, ক্রপ ও রোটেট দিয়ে ছবি আকার পরিবর্তন করতে পারেন।
সুবিধা:
- সম্পূর্ণ ফ্রি, কোন ইন-অ্যাপ পারচেজ নেই
- ব্যবহার করা খুব সহজ
- সব ধরনের এন্ড্রয়েড ও আইফোনে কাজ করে
- স্টোরেজ ম্যানেজমেন্ট ভালো না
- কিছু পুরানো ডিভাইসে স্লো হতে পারে
৩.Picsart: সব-ইন-ওয়ান এডিটিং সলিউশন
পিকসআর্ট শুধু একটি ছবি এডিটিং অ্যাপ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম। ছবি এডিটিংয়ের পাশাপাশি কলাজ তৈরি, ডিজাইন করা, এমনকি ভিডিও এডিটিং ও করা যায় এখানে।
মূল বৈশিষ্ট্য সমূহ:
- হাজার হাজার ফিল্টার ও ইফেক্ট
- ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ করার সুবিধা
- স্টিকার ও টেক্সট যোগ করার অপশন
- এ আই-চালিত ইমেজ জেনারেশন
- রিমিক্স চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ
কিভাবে ব্যবহার করবেন:
Picsart খুললে অনেকগুলো অপশন দেখতে পাবেন। নিচের দিকে " এডিট" অপশনে ক্লিক করে ছবি নির্বাচন করুন। এরপর নিচের টুলবার থেকে ক্রপ, এডজাস্ট, ফিল্টার, ইফেক্ট ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবেন। "রিমুভ ব্যাকগ্রাউন্ড" অপশনটি খুবই কাজের - এক ক্লিকেই ছবির পিছনের অংশ মুছে ফেলে।
সুবিধা:
- এক অ্যাপে হাজারো কাজ করা যায়
- কমিউনিটি ফিচার থাকায় অন্যের কাজ দেখে শেখা যায়
- নিয়মিত নতুন ফিচার যুক্ত হয়
- বিজ্ঞাপন অনেক বেশি
- প্রিমিয়াম ফিচারের জন্য সাবস্ক্রিপশন লাগে
- কিছু ইফেক্ট ওয়াটারমার্ক দেয়
৪.VSCO : ভিনটেজ লুকের জন্য সেরা
VSCO মূলত ফিল্টারের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে যারা ভীনটেজ টাইপের ছবি পছন্দ করেন, তাদের জন্য একটি আদর্শ অ্যাপ। সিম্পল ইন্টারফেস এবং অসাধারণ ফিল্টার কালেকশন এটিকে বিশেষ করে তুলেছে।
মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- ২০০ টির বেশি প্রিমিয়াম প্রিসেট
- অ্যাডভান্সড ক্যামেরা কন্ট্রোল
- ফিল্ম-স্টাইল ফিল্টার
- মিনিমালিস্ট ইন্টারফেস
- VSCO কমিউনিটি
কিভাবে ব্যবহার করবেন:
VSCO অ্যাপ খুলে ছবি সিলেক্ট করলে নিচে বিভিন্ন ফিল্টারের আইকন দেখতে পাবেন। এখানেC1, M5, A6 ইত্যাদি নামের ফিল্টারগুলো খুবই জনপ্রিয়। ফিল্টার সিলেক্ট করার পর আবার ট্যাপ করলে ফিল্টারের তীব্রতা কমানো-বাড়ানো যায়।এডজাস্টমেন্ট টুল দিয়ে এক্সপোজার, কনট্রাস্ট, স্যাচুরেশন ইত্যাদি ঠিক করতে পারেন।সুবিধা:
- ফিল্টারগুলো সত্যিই অসাধারণ
- কোন বিজ্ঞাপন নেই
- কমিউনিটি ফিচার ভালো
- বিনামূল্যের ভার্সনে খুব কম ফিচার
- বেশিরভাগ ভালো ফিল্টার প্রিমিয়াম
- এডিটিং টুল সীমিত
৫.Canva: ডিজাইন প্রেমিদের জন্য
- হাজার হাজার টেমপ্লেট
- ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভার
- ম্যাজিক ইরেজার দিয়ে অবাঞ্ছিত বস্তু মুছতে পারেন
- এ আই-চালিত ইমেজ জেনারেশন
- অ্যানিমেটেড design তৈরি
- টেমপ্লেটের বিশাল কালেকশন
- ব্যবহার করা খুব সহজ
- টিমের সাথে শেয়ার করার সুবিধা
- ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়া কাজ করে না
- প্রিমিয়াম ফিচারের জন্য সাবস্ক্রিপশন লাগে
- মাঝে মাঝে স্লো হয়
৬.LightX: বাংলা টেক্সট সাপোর্ট
- বাংলা ফন্টে টেক্সট যোগ করা যায়
- প্রফেশনাল পোটের্ট এডিটিং
- হেয়ার ডাই ও মেকআপ ইফেক্ট
- ম্যাজিক ফিল্টার
- ক্লোন টুল
- বাংলা টেক্সট সাপোর্ট চমৎকার
- ফ্রি ভার্সনে অনেক ফিচার পাওয়া যায়
- পোটের্ট এডিটিং খুব ভালো
- ইন্টারফেস একটু জটিল।
- বিজ্ঞাপন অনেক
- কিছু ফিচার বুঝতে সময় লাগে
৭.Remini ছবির মান উন্নত করার জন্য
- এ আই-চালিত ইমেজ Enhancment
- পুরনো ছবি রিস্টোর করা
- ফেস ডিটেইল উন্নত করা
- ভিডিও কোয়ালিটি বৃদ্ধি
- ব্যাচ প্রসেসিং
- এ আই টেকনোলজি অসাধারণ কাজ করে
- পুরনো ছবি নতুনের মত হয়
- ব্যবহার করা খুব সহজ
- ফ্রি ভার্সনে সীমিত ব্যবহার
- ওয়াটার মার্ক আসে
- শুধু ইনহান্সমেন্ট-এর জন্য, এডিটিং নয়
৮. Facetune: সেলফি প্রেমীদের জন্য
- ত্বক মসৃণ করার টুল
- দাঁত সাদা করার ফিচার
- চোখ উজ্জ্বল করা
- মেকআপ যোগ করা
- ফেস শেপ চেঞ্জ করা
- পোর্ট্রেট এডিটিং দারুন
- ব্যবহার করা সহজ
- রিয়েলইস্টিক ইফেক্ট
- সম্পূর্ণ পেইড অ্যাপ
- শুধু পোট্রেট-এর জন্য সীমিত
- অতি ব্যবহারে ছবি নকল মনে হয়
৯. PhotoDirector: ডিরেক্টর মত এডিটিং
- এআই-পাওয়ার্ড ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভাল
- মোশন ইফেক্ট দিয়ে ছবিকে অ্যানিমেট করা
- অ্যাকশন ক্যামেরা ইফেক্ট
- এইচডিআর ইফেক্ট
- স্টাইল ট্রান্সফার
- এ আই ফিচারগুলো অসাধারণ
- নিয়মিত আপডেট হয়
- ব্যবহার করা মোটামুটি সহজ
- ফ্রি ভার্সনে সীমিত
- কিছু ফিচার বুঝতে সময় লাগে
- পারফরম্যান্স মাঝে মাঝে ধীর
১০. Pixlr: অনলাইন এডিটরের মোবাইল ভার্সন
- ২ মিলিয়নের বেশি ইফেক্ট কম্বিনেশন
- অটো-ফিক্স ফিচার
- লেয়ার-ভিত্তিক এডিটিং
- কলাজ মেকার
- স্টিকার ও টেক্সটের বিশাল কালেকশন
- প্রচুর ফিল্টার ও ইফেক্ট
- ব্যবহার করা সহজ
- ফ্রি ভার্সনে অনেক ফিচার
- বিজ্ঞাপন বিরক্তি কর
- প্রিমিয়াম ফিচারের জন্য অর্থ দিতে হয়
- কিছু ফিচার পুরনো মনে হয়
কিভাবে সঠিক অ্যাপ নির্বাচন করবেন?
- প্রফেশনাল মানের ফটো এডিটিং করতে চাইলে:Adobe Lightroom বা Snapseed
- সেলফি ও পোট্রের্ট এডিটিং করতে চাইলে:Facetune বা LightX
- সৃজনশীল ডিজাইন ও কলাজ তৈরি করতে চাইলে:Picsart বা Canva
- ভিন্টেজ ফিল্টার পছন্দ করলে:VSCO
- ছবির মান উন্নত করতে চাইলে:Remini
- সম্পূর্ণ ফ্রি আর চাইলে:Snapseed, LightX ( ফ্রি ভার্সন)
- ফ্রিও পেইড মিশ্রিত অ্যাপ চাইলে:Picsart, Canva, Adobe Lightroom
- পেইড অ্যাপ ব্যবহারে রাজি থাকলে:Facetune, VSCO
- নতুনদের জন্য সহজেঅ্যাপ:Canva, Picsart, Snapseed
- একটু এক্সপার্টদের জন্য:Adobe Lightroom, VSCO


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url