২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ

 ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহোৎসব

ফুটবলের কথা উঠলে মানুষের চোখ এক ধরনের আলোয় জ্বলে ওঠে। সেটা চায়ের দোকানে বসে থাকা বাংলাদেশের কিশোর হোক, বা ব্রাজিলের কোন ফাভেলার মাঠে খেলতে থাকা কোন তরুণ - ফুটবল মানে শুধু একটা খেলা না, এটা একটা অনুভূতি। আর সেই অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো বিশ্বকাপ। 

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ

চার বছর পর পর আসে এই মহোৎসব। আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তো শুধু আসছে না - এটা আসছে একেবারে নতুন রূপে, নতুন আকারে, নতুন ইতিহাস নিয়ে। ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে, এই বিশ্বকাপ হতে চলেছে ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জমকালো এবং সবচেয়ে আলোচিত আসর। 

আর কেন হবে না? এবার মাঠে নামছে ৪৮ টি দল, হচ্ছে ১০৪ টি ম্যাচ, আয়োজক তিনটি দেশ - যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো। মাঠে হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কি হতে পারে?

চলুন তাহলে এক এক করে জানি, ২০২৬ বিশ্বকাপের সব খুঁটিনাটি

এক নতুন যুগের শুরু:৪৮ দলের বিশ্বকাপ

ফুটবল বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা নিয়ে ইতিহাস একটু একটু করে এগিয়েছে।১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে ছিল মাত্র ১৩ টি দল। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা ৩২-এ স্থির হয়। সেই ফরম্যাট টিকেছে গত সাতটি বিশ্বকাপ ধরে। 

কিন্তু এবার সব বদলে যাচ্ছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮ টি দল। এটা শুধু একটা সংখ্যা বাড়ানো না - এটা পুরো বিশ্বকাপের চেহারাটাই পাল্টে দিচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকার ছোট ছোট দেশগুলো যারা আগে কোয়ালিফাই করতে পারত না, তাদের জন্য এবার দরজা অনেকটাই খুলে গেছে।

ফরম্যাটটা কিভাবে কাজ করবে? বলছি। ৪৮ টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২ টি গ্রুপে, প্রতি গ্রুপে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্যায়ে প্রতিটি দল তিনটি করে ম্যাচ খেলবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটো দল সরাসরি পরের পর্বে চলে যাবে। এর সাথে যোগ হবে আরও ৮ দল - যারা নিজেদের গ্রুপে তৃতীয় হয়েছে কিন্তু সেরা আট তৃতীয় স্থানাধিকারী দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। এভাবে মোট ৩২ টি দল উঠবে নক আউট পর্বে।

সহজ কথায়, গ্রুপ পর্ব টা অনেকটাই আগের মত, কিন্তু দল বেশি, গ্রুপ বেশি আর রোমাঞ্চও বেশি। তৃতীয় হয়েও পরের পর্বে যাওয়ার সুযোগ থাকাই প্রতিটি ম্যাচই হবে টানটান। কোন দলই আগেভাগে হাল ছেড়ে দিতে পারবে না।

মোট ম্যাচের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ , যেখানে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ছিল মাত্র ৬৪ টি। প্রায় দেড়গুন বেশি ম্যাচ মানে দেড়গুণ বেশি আনন্দ, দেড় গুণ বেশি উত্তেজনা। 

তিন দেশ, এক উৎসব: যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসাথে আয়োজন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো - উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশ মিলে বানিয়ে দিচ্ছে এক অসাধারণ মঞ্চ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগেও বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে, ১৯৯৪ সালে। মেক্সিকো দুইবার করেছে, ১৯৭০ আর ১৯৮৬ সালে। কিন্তু কানাডার জন্য এটা একদম প্রথম অভিজ্ঞতা।

মোট ১৬ টি স্টেডিয়ামে ম্যাচ হবে। শহরগুলোকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে:

পশ্চিমা অঞ্চল:ভ্যাংকুভার, সিয়াটল, সান ফ্রান্সিস্কো, লস অ্যাঞ্জেলেস। 

কেন্দ্রীয় অঞ্চল: গুয়াডালা হারা, মেক্সিকো সিটি, মন্টেরেই, হিউস্টান, ডালাস, ক্যান্সাস সিটি।  

পূর্ব অঞ্চল: আটলান্টা, মিয়ামি, টোরেন্টো, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি। 

ফাইনাল ম্যাচটি হবে নিউইয়র্ক/নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে, ১৯ জুলাই ২০২৬। আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি হবে মিয়ামিতে, ১৮ জুলাই।

টুর্নামেন্টের শুরুটা হবে ১১ জুন ২০২৬ থেকে। মানে এখন থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। 

বেশ কিছু স্টুডিয়ামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা এই বিশ্বকাপ কে আলাদা করে তুলবে। আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টোন আর ভ্যানকুভারের স্টোডিয়াম গুলোতে ছাদ খুলে বন্ধ হয়। গ্রীষ্মের গরমে এটা বেশ কাজে আসবে। গ্রীষ্মকালীন গরম মাথায় রেখেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে - প্রতিটি ম্যাচের দুটো হাফেই তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে, যাতে খেলোয়াড়রা পানি পান করতে পারে। 

টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে কবে থেকে কবে পর্যন্ত?

পুরো টুর্নামেন্ট চলবে ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। প্রায় ৩৯ থেকে ৪০ দিনের এই মহোৎসব
মাঠের পর মাঠ, গোলের পর গোল এবং ম্যাচের পর ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না।

বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের পার্থক্য। আমেরিকা আর বাংলাদেশের মধ্যে সময়ের পার্থক্য অনেকটাই বেশি, তাই অনেক ম্যাচই হয়তো গভীর রাতে দেখতে হবে। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীরা জানেন - বিশ্বকাপের সময় ঘুম একটু কম হলেও চলে!

গ্রুপগুলো এবং মজাদার দ্বৈরথ

ডিসেম্বর ২০২৫-এ ড্র হয়ে গেছে, এবং কয়েকটি গ্রুপ দেখলেই বুকটা একটু কেঁপে ওঠে।

গ্রুপ আই হলো হয়তো এ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত গ্রুপ। কারন এখানে পড়েছে ফ্রান্স আর নরওয়ে। মানে মাঠে মুখোমুখি হবেন কিলিয়ান এমবাপে আর অ্যালিং হালান্ড। ফুটবল দুনিয়ার বর্তমান দুই সেরা তারকার সরাসরি লড়াই - এটা ভাবতেই গায়ে কাটা দেয়।

গ্রুপ জে তে আছে আর্জেন্টিনা অস্ট্রেিয়া,  আলজেরিয়া এবং জর্ডান। মেসির শেষ বিশ্বকাপের সম্ভাবনা থেকে এই গ্রুপটি সারা দুনিয়ার নজরে থাকবে। 

গ্রুপ কে তে পর্তুগাল, কলম্বিয়া, ডি আর কঙ্গো আর উজবেকিস্তান। রোনালদোর শেষ ড্যান্স হবে কি এখানে?

গ্রুপ এল তে আছে ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা আর পানামা। ইংল্যান্ড আর ক্রোয়েশিয়ার লড়াই - ৮ বছর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। সেই প্রতিশোধের আগুন এখনো জ্বলছে কি?

গ্রুপ সি তে ব্রাজিল আছে মরক্কো, স্কটল্যান্ড আর হাইতির সাথে।ক্যান্সেলো কার্লো আনচেলোওির অধীনে ব্রাজিল কি আবার সেই পুরনো ছন্দ ফিরে পাবে?

গ্রুপ এইচ তে আছে স্পেন। ইউরো ২০২৪ জয়ী স্পেন এবার পরপর দুটো বড় শিরোপা  জেততে চাইবে। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস - তরুণ এ দলটি দেখতেই চোখ জুড়িয়ে যায়।

শক্তির হিসাব: কারা জিততে পারে?

এখন আসি সেই প্রশ্নে যা নিয়ে চায়ের দোকান থেকে অফিসের ক্যান্টিনে পর্যন্ত সবাই তর্ক করে - কে জিতবে বিশ্বকাপ?

ফ্রান্স - অন্যতম প্রবল দাবিদার
ফ্রান্স এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি।২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছিল, কিন্তু সেই দল থেকে ফ্রান্স আর ও শক্তিশালী হয়েছে।

কিলিয়ান এমবাপে আছেন ফর্মের মধ্যে। রিয়াল মাদ্রিদে সংগ্রামের পর আন্তর্জাতিক মাঠে তিনি যেন অন্য মানুষ।  আউসমান দেম্বেলে এবং মিশেল  ওলিসেকে থেকে নিয়ে ফ্রান্সের অ্যাটাক লাইন এই বিশ্বকাপের সেরা দের মধ্যে একটা।ডিডিয়ের দেশ হয়তো সমালোচিত হন রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য, কিন্তু ফলাফল তিনি দেন।

যদিও গ্রুপ আইতে নরওয়ে হল্যান্ড আর সেনেগালের মত শক্তিশালী দল আছে, ফ্রান্স বুকিং মার্কেটে শীর্ষ ফেভারিটদের মধ্যে।  

আর্জেন্টিনা - ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন
২০২২ সালে কাতারে যাওয়া হয়েছিল সেটা শুধু একটা চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ছিল না - সেটা ছিল এক রূপকথার সমাপ্তি। মেসির স্বপ্ন পূরণ।

কিন্তু ২০২৬ সালে কি মেসি আবার মাঠে নামবেন? এটা এখনও পরিষ্কার না। আর্জেন্টিনার কোচ বলেছেন, সিদ্ধান্ত মেসির। তবে সবাই চাই মেসিকে আরও একটিবার দেখতে। যদি মেসি খেলেন, তাহলে আর্জেন্টিনার শিরোপা পুনরায় জেতার সম্ভাবনা অনেক। জুলিয়ান আলভারেজ আর লাউতারো মার্তিনেজ ইতোমধ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন তারা মেসি ছাড়াও ব্রাজিলের মতো দলকে হারাতে পারেন।

পরপর দুটো বিশ্বকাপ জেতা অবশ্য অনেক কঠিন - এটা শেষবার করেছিল ব্রাজিল, ১৯.৫৮ আর ১৯৬২ সালে।    

ব্রাজিল - হারানো গৌরব ফিরে পেতে মরিয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ জেতা দল ব্রাজিলের শেষ শিরোপা ২০০২ সালে। তারপর থেকে বারবার হতাশা।২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে জার্মানির কাছে সেই ৭-১ গোলের বিব্রতকর হার এখনো ব্রাজিলিয়ানদের মনে দগদগে ক্ষতের মতো। 

এবার দলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি। ইতালিয়ান এই  গুরু রিয়াল মাদ্রিদে একের পর এক চাম্পিয়ন্স লীগ জিতে বিখ্যাত হয়েছেন। ব্রাজিলে তাকে আনা হয়েছে সে হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র আর রাফিনহা গোলের ভার বহন করবেন। নেইমার আহত থাকায় এবার হয়তো বিশ্বকাপে তাকে দেখা যাবে না। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য এটা সুযোগ - নেইমার-নির্ভরতা ছেড়ে একটা সত্যিকারের দলগত পরিচয় তৈরির। 

মরক্কো আর স্কটল্যান্ডের সাথে একই গ্রুপে পড়েছে ব্রাজিল, যা সহজ নয়। বিশেষ করে মরক্কো ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে প্রমাণ করেছে তারা যে কোন দলের জন্য বিপজ্জনক।

স্পেন -তারুণ্যের জোয়ার

ইউরো ২০২৪ জিতে স্পেন এই বিশ্বকাপে আসছে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে। লামিন ইয়ামালের কথা আলাদাভাবে বলতে হয় - বিশ্বকাপ চলাকালীন এই স্পেনিস তরুণের বয়স হবে মাত্র ১৯। অথচ তার মাঠে পরিপক্কতা দেখলে মনে হয় না এটা কোন কিশোরের খেলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা হতে পারে ইয়ামালের বিশ্বকাপ।   

পেদ্রি, গাভি, নিকো উইলিয়ামস, মোরতা - এই তরুণ দলটি দেখতে আনন্দ। স্পেন তাদের গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী ফেভারিট। যদি ইয়ামাল পুরো ফিটনেসে থাকেন, স্পেন শিরোপার লড়াইয়ে থাকবেই।

ইংল্যান্ড - ৬০ বছরের অপেক্ষা

ইংল্যান্ড তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছিল ১৯৬৬ সালে, নিজেদের মাটিতে। তারপর থেকে কত আশা, কত হতাশা।

এবার থমাস টুখেলের এর নেতৃত্বে ইংল্যান্ড নতুনভাবে শুরু করেছে। হ্যারিকেন এখন ও চমৎকার ফর্মে।জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেল - তরুণদের সমাহার। কিন্তু বড় টুর্নামেন্ট ইংল্যান্ড বারবার চোকার হওয়াই ইতিহাস আছে। এবার কি সেটা বদলাবে?

জার্মানি - নতুন প্রজন্ম

২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি গত কিছু বছর ধরে ভালো করতে পারছে না। কিন্তু ঘরের মাটিতে ইউরো ২০২৪ -এ তারা ভালো খেলেছে এবং কিছুটা হলেও পুরোনো ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। নিক ওল্টেমেড-সহ নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা উঠে আসছে। জার্মানিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পর্তুগাল - রোনালদোর শেষ গল্প?

৪১ বছর বয়সে এটা হয়তো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ারের প্রায় সবকিছু জিতলেও বিশ্বকাপ শিরোপা তার কাছে আজও অধরা।

পর্তুগালের মিডফিল্ড ত্রিভুজ - ভিতিনহা,  জোয়াও নেভেএ, ব্রুনো ফার্নান্দেজ - হয়তো বিশ্বের সেরা। কিন্তু রোনালদো নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি গত দুই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সেভাবে করতে পারেননি। তবু পর্তুগাল এই মিডফিল্ড দিয়ে অনেকদূর যেতে পারে। 

তারকাদের গ্যালারি: যাদের দিকে চোখ থাকবে

এই বিশ্বকাপে কিছু নাম আছে যাদের ছাড়া বিশ্বকাপের কোন আলোচনায় সম্পূর্ণ হয় না।

লিওনেল মেসি - কিংবদন্তের শেষ অধ্যায়?
মেসির কথা লিখতে গেলে সব সময় বুকের ভিতর একটা টান অনুভব করি। এই মানুষটা ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে তিনি তার অসম্পূর্ণ গল্পটা শেষ করেছিলেন।
কিন্তু ২০২৬ -এ মেসি কিমাঠে নামবেন? বয়স হয়েছে ৩৮। ইন্টার মায়ামিতে খেলেছেন। কোচ  স্কালনি বলেছেন, সিদ্ধান্ত মেসির হাতে। যদি তিনি খেলেন - পুরো দুনিয়া একটা শেষবারের মতো তাকে দেখতে মাঠে যাবে, টিভিতে বসবে। 

কিলিয়ান এমবাপে - বর্তমানের সেরা
মেসি-রোনালদো যুগের পরের সেরা খেলোয়াড় কে হবেন তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এমবাপের নাম সবার আগে আসে। গতি, টেকনিক, ফিনিশিং - সবদিক দিয়েই তিনি একটু আলাদা।

রিয়াল মাদ্রিদে গিয়ে শুরুতে কিছুটা সংগ্রাম করলেও আন্তর্জাতিক মাঠে তিনি তুখোড়। এই বিশ্বকাপ হতে পারে এমবাপের পূর্ণ বিকাশের মঞ্চ। 

অ্যালিং হালান্ড - গোল মেশিন
নরওয়ের এই স্ট্রাইকার শুধু গোল করেন। ম্যানচেস্টার সিটিতে মৌসুমের পর মৌসুম রেকর্ড ভেঙে চলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটা বড় ট্রফি তার কাছে অধরা - আর সেটা হলো বিশ্বকাপ। এবার ফ্রান্সের গ্রুপেই পড়েছে নরওয়ে। এমবাপে বনাম হল্যান্ড - এই গ্রুপ স্টেজের ম্যাচটা একটা ফাইনালের মতোই হবে।

লামিন ইয়ামাল - ভবিষ্যতের রাজা?
বয়স মাত্র ১৮ পেরিয়েছে। কিন্তু মাঠে দেখলে মনে হয় এই ছেলে বহু বছর ধরে খেলছে। বার্সেলোনায় তারপর পারফরম্যান্স দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়ামাল-ই হবেন পরবর্তী মেসি। এই বিশ্বকাপে যদি স্পেন ভালো করে, তবে পেছনের ইয়ামালের অবদান বড় হবে। 

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো - ৪১-এ বিশ্বকাপ
৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলা? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগে। কিন্তু রোনালদো কখনো সাধারণ নিয়মে  চলেন না। সৌদি আরবে আল নাসের খেলছেন, ফিটনেস ধরে রেখেছেন। বিশ্বকাপই তার ক্যারিয়ারের একমাত্র বড় অপূর্ণতা। এই শেষ সুযোগে তিনি হয়তো সর্বোচ্চটাই দিতে চাইবেন।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র - ব্রাজিলের আশা
রিয়াল মাদ্রিদে যা করেন ভিনিসিয়াস, সেটা দেখে মানুষ হ্যাঁ হয়ে যায়। তার গতি, ড্রিবলিং আর গোল করার ক্ষমতা তাকে বিশ্বের শীর্ষ খেলোয়াড়দের সারিতে রেখেছে। ব্রাজিলের ২৪ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা শেষ করার দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে।   

ছোট দলগুলোর গল্প: অ্যাপসেটের স্বপ্ন 

বিশ্বকাপের আনন্দের বড় অংশ হলো অ্যাপসেট, মানে দুর্বল দল শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দেওয়া।৪৮ দলের বিশ্বকাপে এই সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।

মরক্কো ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে আফ্রিকার দলগুলো কতটা শক্তিশালী হতে পারে।২০২২-এ তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। এবার তারা ব্রাজিলের গ্রুপে পড়েছে, কিন্তু ভয় নেই তাদের।

সেনেগাল, মিশর, কোর্টে দ্যা ইভোয়ার, ঘানা - আফ্রিকার এই দলগুলো যে কোন ম্যাচে যেকোনো দলকে হারাতে পারে। 

এশিয়া থেকে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সবসময়ই চমক দেয়।২০২২ -এ জাপান স্পেন আর জার্মানিকে হারিয়েছিল গ্রুপ পর্বে! এ দলগুলোকে হালকা ভাবা ঠিক হবে না।

বসনিয়া ও হারজেভিনিয়া কথা বলতে হয়। ইতালি কে কোয়ালিফিকশনে বাদ দিয়ে তারা এবার বিশ্বকাপে এসেছে - এটাই তাদের সাহসের প্রমাণ।

ইতালি নেই, কিন্তু গল্প আছে

বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অনুপস্থিতি হলো ইতালি।২০১৮ -এর পর ২০২২ -এও তারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি। এবারও ব্যর্থ। চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি ফুটবল বিশ্বের জন্য একটা বড় ক্ষতি। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ভবিষ্যৎ

এই বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা ঐতিহ্যগতভাবে ফুটবল-পাগল দেশ নয়। বেশ বল, আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল - এগুলোই সেখানকার প্রধান খেলা। কিন্তু এই বিশ্বকাপ আয়োজন করে চাইছে তার মাটিতে ফুটবলের শিকড় ছড়িয়ে দিতে। 

১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর আমেরিকায় মেজর লীগ সকার (এমএলএস) শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই লীগ বেড়ে উঠেছে। এখন মেসি নিজেই মায়ামিতে খেলেন। এই বিশ্বকাপ সেই বিকাশকে আরো ত্বরান্বিত করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব দলও এবার হোম গ্রাউন্ডের সুবিধাই ভালো করার চেষ্টা করবে।৩২ বছর পর নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ - এই অনুভূতিটা আমেরিকান সমর্থকদের জন্য বিশাল।

প্রযুক্তি ও বিশ্বকাপ ভার ও ভিএআর

আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। ভিএআর (ভিডিও এসিস্টেন্ট রেফারি) এখন প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের অংশ। এই বিশ্বকাপেও থাকবে।

ফিফা ঘোষণা করেছে ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি। সিদ্ধান্তগুলো আরও সঠিক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীরা কোন দলকে সমর্থন করবে?

এটা একটা মজার প্রশ্ন। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা এখনো প্রচন্ড, যদিও দেশের ক্লাব ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবল সেভাবে এগোয়নি। বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশের মানুষ দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে যায় - ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। এই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রায় বিশ্বকাপের ফাইনালের চেয়েও বেশি!

তবে এবার মেসির শেষ বিশ্বকাপের সম্ভাবনা থেকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আবেগটা একটু বেশিই থাকবে। মেসিকে এক আরেকটা শিরোপা জেতাতে চাওয়া - এটা শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের না, সারা পৃথিবীর মেসি-প্রেমীদের চাওয়া। 

আর্থিক দিক: রেকর্ড  রাজস্ব

বিশ্বকাপ শুধু খেলার মাঠের উৎসব না, এটা একটা বিশাল অর্থনৈতিক ঘটনাও। ফিপা আসা করছে এ বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড রাজস্ব আসবে।

৪৮ দলের অংশগ্রহণ মানে আরও বেশি দেশের সমর্থকরা মাঠে আসবেন, আরও বেশি টেলিভিশন অধিকার বিক্রি হবে, আরও বেশি স্পন্সরশিপ আসবে। তিনটি বড় অর্থনীতির দেশ আয়োজক হওয়ায় পুরো উত্তর আমেরিকায় ফুটবল সংক্রান্ত ব্যবসা বাড়বে।  

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে ফাইনাল পর্যন্ত

টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচটি হবে ১১ জুন ২০২৬ । প্রথম ম্যাচগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে কোথায় হবে, কোন দল প্রথম মাঠে নামবে।

গ্রুপ পর্ব চলবে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তারপর শুরু হবে নকআউট পর্ব - রাউন্ড অফ ৩২ (মানের পূর্বের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের মতো), তারপর কোয়াটার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং সবশেষে ফাইনাল।

ফাইনাল হবে ১৯ জুলাই, নিউইয়র্কের কাছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সেদিন সারা পৃথিবী একসাথে টিভির সামনে বসবে।

কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে যা চিরকাল মনে থাকে।

১৯৫৮ সালে ১৭ বছর বয়সে পেলে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করেছিলেন (হ্যান্ড অব গড) এবং একই ম্যাচে সেঞ্চুরি করার পর শতাব্দীর সেরা গোল করেছিলেন।২০১৪ সালে জার্মানি ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের নিজেদের মাটিতে।২০২২ সালে মেসি তার স্বপ্নের ট্রফি পেয়েছিলেন।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কি হবে সেই মুহূর্ত যা আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে - তা এখনো অজানা। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কিছু একটা হবে।

কেন এই বিশ্বকাপ অনন্য?

এ বিশ্বকাপ কয়েকটি কারণে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে:

প্রথমত, এটা প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ - ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর।

দ্বিতীয়ত, এটা প্রথম তিন দেশ মিলে আয়োজন করা বিশ্বকাপ।

তৃতীয়ত, এটা সম্ভবত মেসি এবং রোনালদো ই শেষ বিশ্বকাপ। এই দুই কিংবদন্তি একই বিশ্বকাপে - এটা আর কখনো হবে কিনা সন্দেহ।

চতুর্থত, এমবাপে, হালান্ড, ইয়ামানের মত পরবর্তী প্রজন্মের তারকারা নিজেদের মেলে ধরবে এই বিশ্বকাপে।

পঞ্চমত, ৩২ বছর পর আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপ ফিরছে - উত্তর আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তার নতুন অধ্যায়।

একটি শেষ কথা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা না। এটা হল সারা পৃথিবীর মানুষ এক হওয়ার উপলক্ষ। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্নদেশ - কিন্তু বলটা জালে যাওয়ার মুহূর্তে সবার অনুভূতি এক। 

বাংলাদেশের কোন চায়ের দোকানে বসে টিভিতে বিশ্বকাপ দেখা, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বন্ধুর সাথে তর্ক করা, গভীর রাতে মেসির গোলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা - এই অনুভূতিগুলোই বিশ্বকাপকে বিশেষ করে।

২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ অনেকদিন থেকেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মেসির শেষ নাচ, রোনালদের শেষ চেষ্টা, এমবাপের রাজত্বের শুরু, ইয়া মালের উত্থান, ব্রাজিলের খোঁজা স্বপ্ন, আর্জেন্টিনার সোনার ধরে রাখা লড়াই - এতকিছু একসাথে ঘুরতে দেখা মানে ফুটবলের একটি গোটা যুগ সামনে থেকে অনুভব করা।

১১ জুন থেকে শুরু। পৃথিবীর সব ফুটবলপ্রেমী তাদের পছন্দের দলে জার্সি গায়ে চাপাক, পর্দার সামনে বস, আর স্বপ্ন দেখুক। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন দেখার মৌসুম।

"ফুটবল হল সূর্য, আর বিশ্বকাপ হল সূর্যগ্রহণ - যখন দেখা যায়, সবাই একসাথে তাকায়।"


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url