২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল মহোৎসব
ফুটবলের কথা উঠলে মানুষের চোখ এক ধরনের আলোয় জ্বলে ওঠে। সেটা চায়ের দোকানে বসে থাকা বাংলাদেশের কিশোর হোক, বা ব্রাজিলের কোন ফাভেলার মাঠে খেলতে থাকা কোন তরুণ - ফুটবল মানে শুধু একটা খেলা না, এটা একটা অনুভূতি। আর সেই অনুভূতির সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো বিশ্বকাপ।
চার বছর পর পর আসে এই মহোৎসব। আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তো শুধু আসছে না - এটা আসছে একেবারে নতুন রূপে, নতুন আকারে, নতুন ইতিহাস নিয়ে। ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে, এই বিশ্বকাপ হতে চলেছে ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জমকালো এবং সবচেয়ে আলোচিত আসর।
আর কেন হবে না? এবার মাঠে নামছে ৪৮ টি দল, হচ্ছে ১০৪ টি ম্যাচ, আয়োজক তিনটি দেশ - যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো। মাঠে হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কি হতে পারে?
চলুন তাহলে এক এক করে জানি, ২০২৬ বিশ্বকাপের সব খুঁটিনাটি।
এক নতুন যুগের শুরু:৪৮ দলের বিশ্বকাপ
ফুটবল বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা নিয়ে ইতিহাস একটু একটু করে এগিয়েছে।১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে ছিল মাত্র ১৩ টি দল। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা ৩২-এ স্থির হয়। সেই ফরম্যাট টিকেছে গত সাতটি বিশ্বকাপ ধরে।
কিন্তু এবার সব বদলে যাচ্ছে।
সহজ কথায়, গ্রুপ পর্ব টা অনেকটাই আগের মত, কিন্তু দল বেশি, গ্রুপ বেশি আর রোমাঞ্চও বেশি। তৃতীয় হয়েও পরের পর্বে যাওয়ার সুযোগ থাকাই প্রতিটি ম্যাচই হবে টানটান। কোন দলই আগেভাগে হাল ছেড়ে দিতে পারবে না।
মোট ম্যাচের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ , যেখানে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ছিল মাত্র ৬৪ টি। প্রায় দেড়গুন বেশি ম্যাচ মানে দেড়গুণ বেশি আনন্দ, দেড় গুণ বেশি উত্তেজনা।
তিন দেশ, এক উৎসব: যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসাথে আয়োজন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো - উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশ মিলে বানিয়ে দিচ্ছে এক অসাধারণ মঞ্চ।
মোট ১৬ টি স্টেডিয়ামে ম্যাচ হবে। শহরগুলোকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে:
পশ্চিমা অঞ্চল:ভ্যাংকুভার, সিয়াটল, সান ফ্রান্সিস্কো, লস অ্যাঞ্জেলেস।
কেন্দ্রীয় অঞ্চল: গুয়াডালা হারা, মেক্সিকো সিটি, মন্টেরেই, হিউস্টান, ডালাস, ক্যান্সাস সিটি।
পূর্ব অঞ্চল: আটলান্টা, মিয়ামি, টোরেন্টো, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি।
ফাইনাল ম্যাচটি হবে নিউইয়র্ক/নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে, ১৯ জুলাই ২০২৬। আর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি হবে মিয়ামিতে, ১৮ জুলাই।
টুর্নামেন্টের শুরুটা হবে ১১ জুন ২০২৬ থেকে। মানে এখন থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি।
বেশ কিছু স্টুডিয়ামের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা এই বিশ্বকাপ কে আলাদা করে তুলবে। আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টোন আর ভ্যানকুভারের স্টোডিয়াম গুলোতে ছাদ খুলে বন্ধ হয়। গ্রীষ্মের গরমে এটা বেশ কাজে আসবে। গ্রীষ্মকালীন গরম মাথায় রেখেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে - প্রতিটি ম্যাচের দুটো হাফেই তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে, যাতে খেলোয়াড়রা পানি পান করতে পারে।
টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে কবে থেকে কবে পর্যন্ত?
গ্রুপগুলো এবং মজাদার দ্বৈরথ
শক্তির হিসাব: কারা জিততে পারে?
স্পেন -তারুণ্যের জোয়ার
ইংল্যান্ড - ৬০ বছরের অপেক্ষা
জার্মানি - নতুন প্রজন্ম
পর্তুগাল - রোনালদোর শেষ গল্প?
তারকাদের গ্যালারি: যাদের দিকে চোখ থাকবে
ছোট দলগুলোর গল্প: অ্যাপসেটের স্বপ্ন
বিশ্বকাপের আনন্দের বড় অংশ হলো অ্যাপসেট, মানে দুর্বল দল শক্তিশালী দলকে হারিয়ে দেওয়া।৪৮ দলের বিশ্বকাপে এই সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।
মরক্কো ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে আফ্রিকার দলগুলো কতটা শক্তিশালী হতে পারে।২০২২-এ তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। এবার তারা ব্রাজিলের গ্রুপে পড়েছে, কিন্তু ভয় নেই তাদের।
সেনেগাল, মিশর, কোর্টে দ্যা ইভোয়ার, ঘানা - আফ্রিকার এই দলগুলো যে কোন ম্যাচে যেকোনো দলকে হারাতে পারে।
এশিয়া থেকে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া সবসময়ই চমক দেয়।২০২২ -এ জাপান স্পেন আর জার্মানিকে হারিয়েছিল গ্রুপ পর্বে! এ দলগুলোকে হালকা ভাবা ঠিক হবে না।
বসনিয়া ও হারজেভিনিয়া কথা বলতে হয়। ইতালি কে কোয়ালিফিকশনে বাদ দিয়ে তারা এবার বিশ্বকাপে এসেছে - এটাই তাদের সাহসের প্রমাণ।
ইতালি নেই, কিন্তু গল্প আছে
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অনুপস্থিতি হলো ইতালি।২০১৮ -এর পর ২০২২ -এও তারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি। এবারও ব্যর্থ। চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী ইতালির এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি ফুটবল বিশ্বের জন্য একটা বড় ক্ষতি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ভবিষ্যৎ
এই বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা ঐতিহ্যগতভাবে ফুটবল-পাগল দেশ নয়। বেশ বল, আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল - এগুলোই সেখানকার প্রধান খেলা। কিন্তু এই বিশ্বকাপ আয়োজন করে চাইছে তার মাটিতে ফুটবলের শিকড় ছড়িয়ে দিতে।
১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর আমেরিকায় মেজর লীগ সকার (এমএলএস) শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই লীগ বেড়ে উঠেছে। এখন মেসি নিজেই মায়ামিতে খেলেন। এই বিশ্বকাপ সেই বিকাশকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব দলও এবার হোম গ্রাউন্ডের সুবিধাই ভালো করার চেষ্টা করবে।৩২ বছর পর নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ - এই অনুভূতিটা আমেরিকান সমর্থকদের জন্য বিশাল।
প্রযুক্তি ও বিশ্বকাপ ভার ও ভিএআর
আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। ভিএআর (ভিডিও এসিস্টেন্ট রেফারি) এখন প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের অংশ। এই বিশ্বকাপেও থাকবে।
ফিফা ঘোষণা করেছে ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি। সিদ্ধান্তগুলো আরও সঠিক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীরা কোন দলকে সমর্থন করবে?
এটা একটা মজার প্রশ্ন। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা এখনো প্রচন্ড, যদিও দেশের ক্লাব ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবল সেভাবে এগোয়নি। বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশের মানুষ দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে যায় - ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। এই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রায় বিশ্বকাপের ফাইনালের চেয়েও বেশি!
তবে এবার মেসির শেষ বিশ্বকাপের সম্ভাবনা থেকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আবেগটা একটু বেশিই থাকবে। মেসিকে এক আরেকটা শিরোপা জেতাতে চাওয়া - এটা শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের না, সারা পৃথিবীর মেসি-প্রেমীদের চাওয়া।
আর্থিক দিক: রেকর্ড রাজস্ব
বিশ্বকাপ শুধু খেলার মাঠের উৎসব না, এটা একটা বিশাল অর্থনৈতিক ঘটনাও। ফিপা আসা করছে এ বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড রাজস্ব আসবে।
৪৮ দলের অংশগ্রহণ মানে আরও বেশি দেশের সমর্থকরা মাঠে আসবেন, আরও বেশি টেলিভিশন অধিকার বিক্রি হবে, আরও বেশি স্পন্সরশিপ আসবে। তিনটি বড় অর্থনীতির দেশ আয়োজক হওয়ায় পুরো উত্তর আমেরিকায় ফুটবল সংক্রান্ত ব্যবসা বাড়বে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে ফাইনাল পর্যন্ত
টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচটি হবে ১১ জুন ২০২৬ । প্রথম ম্যাচগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে কোথায় হবে, কোন দল প্রথম মাঠে নামবে।
গ্রুপ পর্ব চলবে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তারপর শুরু হবে নকআউট পর্ব - রাউন্ড অফ ৩২ (মানের পূর্বের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের মতো), তারপর কোয়াটার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং সবশেষে ফাইনাল।
ফাইনাল হবে ১৯ জুলাই, নিউইয়র্কের কাছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সেদিন সারা পৃথিবী একসাথে টিভির সামনে বসবে।
কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে যা চিরকাল মনে থাকে।
১৯৫৮ সালে ১৭ বছর বয়সে পেলে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করেছিলেন (হ্যান্ড অব গড) এবং একই ম্যাচে সেঞ্চুরি করার পর শতাব্দীর সেরা গোল করেছিলেন।২০১৪ সালে জার্মানি ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের নিজেদের মাটিতে।২০২২ সালে মেসি তার স্বপ্নের ট্রফি পেয়েছিলেন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে কি হবে সেই মুহূর্ত যা আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে - তা এখনো অজানা। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কিছু একটা হবে।
কেন এই বিশ্বকাপ অনন্য?
এ বিশ্বকাপ কয়েকটি কারণে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে:
প্রথমত, এটা প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপ - ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসর।
দ্বিতীয়ত, এটা প্রথম তিন দেশ মিলে আয়োজন করা বিশ্বকাপ।
তৃতীয়ত, এটা সম্ভবত মেসি এবং রোনালদো ই শেষ বিশ্বকাপ। এই দুই কিংবদন্তি একই বিশ্বকাপে - এটা আর কখনো হবে কিনা সন্দেহ।
চতুর্থত, এমবাপে, হালান্ড, ইয়ামানের মত পরবর্তী প্রজন্মের তারকারা নিজেদের মেলে ধরবে এই বিশ্বকাপে।
পঞ্চমত, ৩২ বছর পর আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপ ফিরছে - উত্তর আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তার নতুন অধ্যায়।
একটি শেষ কথা
ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা না। এটা হল সারা পৃথিবীর মানুষ এক হওয়ার উপলক্ষ। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্নদেশ - কিন্তু বলটা জালে যাওয়ার মুহূর্তে সবার অনুভূতি এক।
বাংলাদেশের কোন চায়ের দোকানে বসে টিভিতে বিশ্বকাপ দেখা, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বন্ধুর সাথে তর্ক করা, গভীর রাতে মেসির গোলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা - এই অনুভূতিগুলোই বিশ্বকাপকে বিশেষ করে।
২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ অনেকদিন থেকেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মেসির শেষ নাচ, রোনালদের শেষ চেষ্টা, এমবাপের রাজত্বের শুরু, ইয়া মালের উত্থান, ব্রাজিলের খোঁজা স্বপ্ন, আর্জেন্টিনার সোনার ধরে রাখা লড়াই - এতকিছু একসাথে ঘুরতে দেখা মানে ফুটবলের একটি গোটা যুগ সামনে থেকে অনুভব করা।
১১ জুন থেকে শুরু। পৃথিবীর সব ফুটবলপ্রেমী তাদের পছন্দের দলে জার্সি গায়ে চাপাক, পর্দার সামনে বস, আর স্বপ্ন দেখুক। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন দেখার মৌসুম।
"ফুটবল হল সূর্য, আর বিশ্বকাপ হল সূর্যগ্রহণ - যখন দেখা যায়, সবাই একসাথে তাকায়।"

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url