নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স
নারীর ক্ষমতায়নের সোপান: নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স ও কেরিয়ার করার সুযোগ
বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তিতে প্লাবিত। ডিজিটাল এই যুগে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট একটি অত্যন্ত চাহিদা সম্পন্ন দক্ষতা। কিন্তু প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে প্রয়োজন সঠিক দিক নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সন্তোষজনক নয়।
এই বৈষম্য দূর করতে এবং নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে বিশ্বব্যাপী নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স যা তাদের জন্য এক দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
এই আর্টিকেলে আমরা সেরকম কিছু ফ্রি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ও বাংলাদেশী উদ্যোগ সম্পর্কে জানব যা যে-কোনো নারীকে ওয়েব ডেভলপার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে সহায়তা করবে।
প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ: বর্তমান প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকভাবে প্রযুক্তি খাতকে পুরুষ-শাসিত হিসেবে গণ্য করা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে শুরু করে স্থানীয় উদ্যোগগুলো নারীদের প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তুলতে কাজ করছে। নারীরা যখন প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করেন, তখন তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হন না, বরং পুরো সমাজ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেন।
নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। খরচের বাধা দূর করে দেওয়ায়, ঘরে বসেই আগ্রহী নারীরা এই সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে পারেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে অনেক মেধাবী নারী অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়েন, সেখানে এই উদ্যোগগুলো তাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ।
শীর্ষ আন্তর্জাতিক ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স
১.কোড ফার্স্ট গার্লস (Code First Girls)
- MOOC স্প্রিন্ট ও চ্যালেঞ্জ: ৪ সপ্তাহের বিগিনার লেভেলের কোর্স।
- @ ইউনি কিকস্টার্টার: ৮ সপ্তাহের ক্লাস যা জাভাস্ক্রিপ্ট, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, পাইথন ও ডেটা নিয়ে কাজ করে।
- CFG ডিগ্রী: ১৬ সপ্তাহেরইনটেনসিভ কোর্স যা শেষে চাকুরীর সুযোগ দেয়া হয়।
এই নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স এর আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এটি NatWest, Deloitte, Nike-এর মত বড় কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ করেছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা সহজে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
২. অ্যাডা ডেভলপারস একাডেমি (Ada Developers Academy)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে হলে অবস্থিত অ্যাডা ডেভলপারস একাডেমি একটি টিউশন-ফ্রি প্রোগ্রাম অফার করে যেখানে ফুল-সট্যাক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখানো হয। SwitchUP-এর রিভিউ অনুযায়ী, এটি একটি ৫২ সপ্তাহের প্রোগ্রাম, যার মধ্যে ৬+ মাস ক্লাসরুম ট্রেনিং এবং বাকি ৬ মাস ইন্টার্নশিপ।
এখানে শেখানো বিষয়গুলো র মধ্যে রয়েছে:
- HTML, CSS
- Ruby on Rails
- JavaScript
এটি নারী ও নন-বাইনারি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি, যারা টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার শুরু করতে আগ্রহী। স্নাতক শেষে তারা সরাসরি প্রযুক্তি কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পান।
৩.গার্ল ডেভেলপ ইট (Girl Develop It)
গার্ল ডেভেলপ ইট একটি অলাভজনক সংস্থা যাদের মটো হলো, "Dont be shy. Develop it." তারা নারীদের বিচারহীন পরিবেশে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শেখানোর জন্য কাজ করে। এই সংস্থাটি শুধু বিগিনারদের জন্যই নয়, যারা ইতিমধ্যে ডেভলপার হিসেবে কাজ করেছেন তাদের জন্যও অ্যাডভান্সড কোর্স অফার করে।তাদের ক্লাসগুলো ছোট (১২-১৫) জন হয়, যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সহায়তা পান। বিশেষ করে যাদের ল্যাপটপ নেই তাদের জন্য ডোনেটেড ল্যাপটপের ব্যবস্থাও রয়েছে এই সংস্থার।
৪.০১ ফাউন্ডার্স লন্ডন - উইমেন ইনটেক
লন্ডনের নারীদের জন্য ০১ একটি ফাউন্ডার্স ৬ সপ্তাহের ফান্ডেড কোর্স অফার করেছে, যেখানে HTML, CSS এবং JavaScript- এর ফাউন্ডেশন শেখানো হয়। এ কোর্সটি তাদের জন্য যারা লন্ডনে বাসিন্দা এবং বেকার অথবা যাদের আয় ২৭০০০ -এর নিচে। পুরো পো কোর্সটি প্রজেক্ট-লেড পদ্ধতিতে পরিচালিত, হয় যেখানে শেষ পর্যন্ত একটি রেসপন্সিভ পোর্টফলিও ওয়েবসাইট বানাতে হয়।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও নারী: শেবিল্ডস(SheBuilds) ইনশিয়েটিভ
প্রযুক্তির জগত এখন শুধু কোডিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে দক্ষতা অর্জনও জুরুরি। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, এআই-চালিত অ্যাপ বিল্ডার লাভেবল (Lovable) তাদের প্ল্যাটফর্ম 24 ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণরূপে ফ্রি করে দেই। এই উদ্বেগের নাম ছিল "SheBuilds " এবং এটি Anthropic ও Stripe-এর সাথে যৌথভাবে পরিচালিত হয়।
এই উদ্যোগটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির জটিলতাকে পেছনে ফেলে নারীরা এখন সরাসরি অ্যাপ্লিকেশন বিল্ড করতে পারেন। এটি একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শুধু কোডিং শেখা নয়, বরং ভাবনার জগত কে বাস্তব রূপ দেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে এতে।। এই ধরনের উদ্যোগগুলো দেখায়, নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স ভবিষ্যতে আর ও বেশি ইন্টারএকটিভ এবং অ্যাক্সেসযোগ্য হবে।
বাংলাদেশের পেক্ষাপট: নারী উদ্যোক্তা ও ডেভলপার তৈরীর মডেল
বাংলাদেশ ও নারীদের প্রযুক্তি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে একাধিক সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। নিচে সেসব উদ্যোগের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
হার পাওয়ার (Her Power) প্রকল্প
Riseup Labs এবং আইসিটি ডিভিশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত Her Power প্রকল্পটি রাজশাহী বিভাগের বারটি উপজেলার ৯৬০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এটি গ্রামীন নারীদের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
প্রশিক্ষণের কাঠামো (৬ মাস):
- ৪ মাস: নির্দিষ্ট সাবজেক্ট ভিত্তিক কোর্স (যেমন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন)।
- ১ মাস: ইংরেজি দক্ষতা ও ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের কৌশল।
- ১মাস: মেন্টরশিপ ও ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে-হাতে কলমে শেখা।
এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে একটি হাই-কনফিগারেশন ল্যাপটপ এবং মাসিক ভ্রমণ ভাতা দেওয়া হয়েছে। এটি আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে তাদের শেখার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। এ প্রকল্পের সফলভাবে ২৪০ জন নারীকে নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স সম্পূর্ণ করিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা এখন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে করার সুযোগ পাচ্ছেন।
গ্রামীণফোন একাডেমি ও ওয়ার্ডপ্রেস প্রশিক্ষণ
সম্প্রতি গ্রামীণফোন একাডেমি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (HDNB) -এর সাথে যৌথভাবে একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই প্রোগ্রামটিতে ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এর উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
যেহেতু এটি একটি সিলেক্টিভ প্রোগ্রাম, তাই এখানে ভর্তি হতে হলে শর্ট অ্যাসেসমেন্ট দিতে হবে। এটি নারীদের জন্য ওয়ার্ডপ্রেস শেখার একটি চমৎকার সুযোগ, যার বর্তমানে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওয়েবসাইট তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
আই ক্যান কোড(I Can Code) ওয়ার্কশপ
প্রিনিউর ল্যাব ও ইএমকে সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত "I Can - Web Development Workshop for Female Developers" ২০২৩ সালে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই ওয়ার্কশপটি ছিল হাইব্রিড পদ্ধতিতে (ভার্চুয়াল ও ফিজিক্যাল)।
এখানে অংশগ্রহণকারীরা ফ্রন্ট এন্ড (HTML, CSS) এবং ব্যাক এন্ড (PHP,MySSOL) শেখার সুযোগ পান। উল্লেখ্য, এই ওয়ার্কশপটি পরিচালনা করেন গুগল ডেভেলপার গ্রুপ ঢাকার ম্যানেজার রাশিক ইসরাক নাহিয়ান। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক মেন্টরশিপ পেলে নারীরা যেকোনো প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারেন।
সিস্টারস অফ কোড (Sisaers of Code)
কম্বোডিয়ানের ভিত্তিক সংস্থা সিস্টারস অফ কোড ২০২৬ সালে তাদের প্রথম এমপ্লয়মেন্ট স্কিল প্রোগ্রাম (ESP) চালু করেছে, যা বাংলাদেশের নারীদের জন্যও একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। এই প্রোগ্রামে Website Development and UX/UI Design কোর্সটি ১৪ সপ্তাহের ইনটেনসিভ ট্রেনিং অফার করে।
এখানে HTML, CSS, JavaScript, Bootstarp, Figma এবং Farmer শেখানো হয়। বিশেষ করে, গিট ও গিটহাব ব্যবহার করে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট শেখানো হয়, যা একজন প্রফেশনাল ডেভলপারের জন্য অপরিহার্য।
বিনামূল্যে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখার জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স
যদিও উপরের উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান ভিত্তিক, তবুও যে কোন নারী চাইলে অনলাইনে প্রচুর ফ্রি রিসোর্স পেয়ে যাবেন ই-বুক ফাউন্ডেশনের (EbookFoundation) বিনামূল্যে প্রোগ্রামিং বইয়ের প্রকল্পটি সবচেয়ে বড় উৎস এতে বাংলা ভাষাতেও প্রচুর রিসোর্স রয়েছে।
যে কোন নারী যিনি নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স খুজছেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় টুপিক সমূহ:
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও উপসংহার
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, "হার পাওয়ার" বা" আই ক্যান কোড"-এর মত উদ্যোগ গুলি যদি আরও বৃহৎ পরিসরে নেওয়া যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তি হাতে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রতিটি নারীর উচিত এই সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহার করা। বর্তমানে যেহেতু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য ফ্রি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স দিচ্ছে, তাই সময় নষ্ট না করে এখনই তালিকাভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন।



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url